পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো K, L, M, N ইত্যাদি কক্ষপথে বিন্যস্ত থাকে। বহিঃস্থ স্তর বলতে ইলেকট্রন আছে এমন সর্বশেষ কক্ষপথকে বোঝায়। এই স্তরের ইলেকট্রনগুলোই যোজ্যতা ইলেকট্রন।
অণু গঠনের সময় বিভিন্ন মৌলের পরমাণু সর্বশেষ কক্ষপথের ইলেকট্রন বর্জন, গ্রহণ বা ভাগাভাগি করে। কোনো মৌলের একটি পরমাণুর সাথে অন্য মৌলের পরমাণু যুক্ত হওয়ার এই ক্ষমতাকে যোজনী বা যোজ্যতা বলে।
একাধিক মৌলের কয়েকটি পরমাণু বা আয়ন মিলে ধনাত্মক বা ঋণাত্মক আধানযুক্ত যে পরমাণুগুচ্ছ গঠন করে এবং একটি মৌলের আয়নের মতো আচরণ করে, তাকে যৌগমূলক বলে। এখানে পুরো গুচ্ছটিকে একটি একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোনো যৌগের অণুকে মৌল বা যৌগমূলকের প্রতীক ও পরমাণুর সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করাই যৌগের রাসায়নিক সংকেত। সংখ্যা সংকেতের নিচে ডান পাশে ছোট করে লেখা হয়। যেমন পানির সংকেত H₂O।
কোনো মৌল বা যৌগের একটি অণুতে কোন মৌলের কতটি পরমাণু আছে, তা প্রতীক ও সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করাকে আণবিক সংকেত বা রাসায়নিক সংকেত বলে। প্রোপেনের আণবিক সংকেত C₃H₈।
নিষ্ক্রিয় গ্যাস হলো পর্যায় সারণির ১৮ নম্বর গ্রুপের এমন গ্যাসীয় মৌল, যেগুলো সাধারণত কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না। এদের নোবেল গ্যাসও বলা হয়।
ডট-ক্রস চিত্র হলো বিন্দু ও ক্রস দিয়ে যোজ্যতা ইলেকট্রন দেখিয়ে রাসায়নিক বন্ধন বোঝানোর পদ্ধতি। এক পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্দু এবং অন্যটির ইলেকট্রন ক্রস দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
অষ্টক নিয়ম হলো বন্ধন গঠনের সময় ইলেকট্রন ত্যাগ, গ্রহণ বা শেয়ারের মাধ্যমে পরমাণুর বহিঃস্থ স্তরে আটটি ইলেকট্রনের স্থিতিশীল বিন্যাস অর্জনের প্রবণতা। হিলিয়াম ছাড়া নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর বহিঃস্থ স্তরে এই বিন্যাস থাকে।
রাসায়নিক বন্ধন হলো সেই আকর্ষণ বল, যা পরমাণুগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত রাখে। পদার্থের অণুতে পরমাণুগুলো শুধু পাশাপাশি জমা থাকে না; তাদের মধ্যে আকর্ষণ কার্যকর থাকে।
নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জন বলতে অন্য মৌলের পরমাণু বা বন্ধনে যুক্ত পরমাণুর ইলেকট্রনের বিন্যাস নিষ্ক্রিয় গ্যাসের স্থিতিশীল বিন্যাসের অনুরূপ হওয়াকে বোঝায়।
ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন সৃষ্টির মূল কারণ হলো পরমাণুর স্থিতিশীল ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জনের প্রবণতা। অষ্টক নিয়ম অনুযায়ী পরমাণু বহিঃস্থ স্তরে আটটি ইলেকট্রনের বিন্যাস পেতে ইলেকট্রন ত্যাগ বা গ্রহণ করতে পারে।
আয়নিক বন্ধন হলো ইলেকট্রন স্থানান্তরের ফলে সৃষ্ট বিপরীত আধানযুক্ত ক্যাটায়ন ও অ্যানায়নকে যুক্ত রাখার তড়িৎ আকর্ষণ বল। একে তড়িৎযোজী বন্ধনও বলা হয়। সাধারণত ধাতু ইলেকট্রন ত্যাগ করে এবং অধাতু সেই ইলেকট্রন গ্রহণ করে।
আয়নিক বন্ধন হলো ইলেকট্রন আদান-প্রদানের ফলে সৃষ্ট বিপরীত আধানযুক্ত আয়নগুলোর মধ্যকার শক্তিশালী তড়িৎ আকর্ষণ। ধনাত্মক আয়নকে ক্যাটায়ন এবং ঋণাত্মক আয়নকে অ্যানায়ন বলে।
সমযোজী বন্ধন হলো দুটি অধাতব পরমাণুর মধ্যে এক বা একাধিক জোড়া ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে গঠিত রাসায়নিক বন্ধন। শেয়ার করা ইলেকট্রন জোড় উভয় পরমাণুর কাজে লাগে।
খাদ্য লবণ ও চিনি দেখতে দানাদার হলেও উত্তপ্ত করলে একই আচরণ করে না। খাদ্য লবণ, NaCl, একটি আয়নিক যৌগ; চিনি, C₁₂H₂₂O₁₁, একটি সমযোজী যৌগ। এখানে Na সোডিয়াম, Cl ক্লোরিন, C কার্বন, H হাইড্রোজেন এবং O অক্সিজেনের প্রতীক।
নির্দিষ্ট চাপে কঠিন পদার্থ তরলে পরিণত হওয়ার তাপমাত্রা হলো গলনাঙ্ক। তরলের সর্বত্র বুদবুদ সৃষ্টি হয়ে ফুটতে থাকার তাপমাত্রা হলো স্ফুটনাঙ্ক। তাপমাত্রার SI একক কেলভিন, K; দৈনন্দিন কাজে ডিগ্রি সেলসিয়াসও ব্যবহৃত হয়।
লবণপানি ও চিনির পানি দেখতে একই রকম স্বচ্ছ হতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ পরিবাহিতা, অর্থাৎ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে দেওয়ার ক্ষমতা, দিয়ে তাদের পার্থক্য বোঝা যায়। খাদ্য লবণ একটি আয়নিক যৌগ এবং চিনি একটি সমযোজী যৌগ।
লোহার জানালার গ্রিল, তামার তার, অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র ও সোনার অলংকার অসংখ্য ধাতব পরমাণু দিয়ে তৈরি। পরমাণুগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকে না; ধাতুর মধ্যে নিয়মিত ত্রিমাত্রিক সজ্জা গঠন করে।
এক খণ্ড ধাতুর পরমাণুগুলো যে আকর্ষণের মাধ্যমে যুক্ত থাকে, তাকে ধাতব বন্ধন বলে। কণার সাহায্যে আরও স্পষ্টভাবে বললে, এটি ধনাত্মক পারমাণবিক শাঁস ও ঋণাত্মক সঞ্চরণশীল ইলেকট্রনের মধ্যকার তড়িৎ আকর্ষণ।
ধাতুর বিদ্যুৎ পরিবাহিতা হলো তার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে দেওয়ার ক্ষমতা। তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো ধাতু ভালো পরিবাহী, কারণ এদের মধ্যে চলাচলযোগ্য ইলেকট্রন থাকে।
আয়নিক যৌগ আয়নিক বন্ধনে এবং সমযোজী যৌগ সমযোজী বন্ধনে গঠিত হয়। রান্নাঘরের খাদ্য লবণ ও চিনি, কাপড়কাচা সোডা, আলমারিতে রাখা ন্যাপথলিন এবং কর্পূর নিয়ে এদের শনাক্ত করার অনুশীলন করা যায়।
রাজশাহীর একটি বিদ্যালয়ের রসায়ন গবেষণাগারে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তিনটি পরিচিত স্থানীয় যৌগ নিয়ে একটি তুলনামূলক পরীক্ষা পরিচালনা করল। পাত্র-১: খাবার লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl); পাত্র-২: খাবার চিনি বা সুক্রোজ (C₁₂H₂₂O₁₁); এবং পাত্র-৩: বৈদ্যুতিক তারে ব্যবহৃত তামা (Cu) ধাতু। শিক্ষার্থীরা প্রতিটি কঠিন পদার্থের গলনাঙ্ক পর্যবেক্ষণ করল, তাদের পানিতে দ্রবণীয়তা পরীক্ষা করল এবং একটি ব্যাটারি ও বাল্বযুক্ত বর্তনী ব্যবহার করে কঠিন ও দ্রবীভূত অবস্থায় তাদের বিদ্যুৎ পরিবাহিতা যাচাই করল।
ক
যোজ্যতা ইলেকট্রন (valence electron) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
কোনো মৌলের পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাসে সর্ববহিঃস্থ প্রধান শক্তিস্তরে অবস্থিত মোট ইলেকট্রন সংখ্যাকে তার যোজ্যতা ইলেকট্রন বলে।
খ
নিষ্ক্রিয় গ্যাসসমূহ রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা স্থিতিশীল কেন — অষ্টক নিয়মের আলোকে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
হিলিয়াম ব্যতীত সকল নিষ্ক্রিয় গ্যাসের (যেমন নিয়ন, আর্গন) সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে আটটি ইলেকট্রন (অষ্টক পূর্ণ) বিদ্যমান থাকে এবং হিলিয়ামের একমাত্র স্তরে দুটি ইলেকট্রন পূর্ণ থাকে। এই স্থিতিশীল ইলেকট্রন বিন্যাস থাকার কারণে তারা স্বাভাবিক অবস্থায় ইলেকট্রন গ্রহণ, বর্জন বা শেয়ার করার কোনো প্রবণতা দেখায় না। ফলে তাদের রাসায়নিক আসক্তি থাকে না এবং তারা অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় ও স্থিতিশীল আচরণ করে।
গ
পাত্র-১ এর যৌগটি (NaCl) কীভাবে গঠিত হয় তা ইলেকট্রন আদান-প্রদান ও ডট-ক্রস চিত্রের ধারণার আলোকে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
সোডিয়াম (Na, পারমাণবিক সংখ্যা ১১) এর ইলেকট্রন বিন্যাস হলো ২, ৮, ১ এবং ক্লোরিন (Cl, পারমাণবিক সংখ্যা ১৭) এর ইলেকট্রন বিন্যাস হলো ২, ৮, ৭। স্থিতিশীল নিয়নের (২, ৮) ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জনের জন্য সোডিয়াম তার বহিঃস্থ স্তরের ১টি যোজ্যতা ইলেকট্রন বর্জন করে ধনাত্মক সোডিয়াম ক্যাটায়নে (Na⁺) পরিণত হয়: Na → Na⁺ + e⁻। অপরদিকে, ক্লোরিন পরমাণু ওই বর্জিত ইলেকট্রনটি গ্রহণ করে স্থিতিশীল আর্গনের (২, ৮, ৮) অষ্টক পূর্ণ করে ঋণাত্মক ক্লোরাইড অ্যানায়নে (Cl⁻) পরিণত হয়: Cl + e⁻ → Cl⁻। এরপর বিপরীত আধানযুক্ত Na⁺ ও Cl⁻ আয়নগুলি শক্তিশালী স্থির বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বলের (তড়িৎযোজী বা আয়নিক বন্ধন) মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) স্ফটিক গঠন করে।
ঘ
উদ্দীপকের পাত্র-১ (NaCl), পাত্র-২ (চিনি) এবং পাত্র-৩ (তামা) এর মধ্যে গলনাঙ্ক ও বিদ্যুৎ পরিবাহিতার ভিন্নতার কারণ বন্ধন প্রকৃতির আলোকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের তিনটি পদার্থের ভৌত ধর্ম তাদের বন্ধন প্রকৃতির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। প্রথমত, গলনাঙ্ক: পাত্র-১ এর NaCl আয়নিক যৌগ, যেখানে Na⁺ ও Cl⁻ আয়নগুলির মধ্যে ত্রিমাত্রিক কেলাসে অত্যন্ত শক্তিশালী স্থির বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বল কার্যকর থাকে। এই শক্তিশালী আকর্ষণ ভাঙতে প্রচুর তাপশক্তির প্রয়োজন হওয়ায় NaCl-এর গলনাঙ্ক অত্যন্ত উচ্চ (801 °C)। পাত্র-৩ এর তামা ধাতুতে ধাতব বন্ধন বিদ্যমান, যেখানে ধনাত্মক ধাতব আয়নগুলো সঞ্চারণশীল ইলেকট্রন সাগরের সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ থাকে, ফলে তামার গলনাঙ্কও বেশ উচ্চ (1085 °C)। অপরদিকে পাত্র-২ এর চিনি (C₁₂H₂₂O₁₁) সমযোজী যৌগ, যার অণুগুলোর মধ্যে অত্যন্ত দুর্বল আন্তঃআণবিক ভ্যান ডার ওয়ালস আকর্ষণ বল বিদ্যমান। অল্প তাপেই এই দুর্বল বন্ধন ভেঙে যায় বলে চিনির গলনাঙ্ক অত্যন্ত কম (প্রায় 186 °C)। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ পরিবাহিতা: তামা ধাতুতে উন্মুক্ত সঞ্চারণশীল ইলেকট্রন (delocalized electrons) বিদ্যমান থাকে, তাই কঠিন ও তরল উভয় অবস্থায় তামা চমৎকার বিদ্যুৎ পরিবাহী। NaCl কঠিন অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহন করে না কারণ এর আয়নগুলি কেলাসে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ; কিন্তু পানিতে দ্রবীভূত করলে মুক্ত Na⁺ ও Cl⁻ আয়নগুলি চলাচলের মাধ্যমে দ্রবণকে বিদ্যুৎ পরিবাহী করে। পক্ষান্তরে, চিনি সমযোজী যৌগ হওয়ায় পানিতে শুধু অণু হিসেবে দ্রবীভূত হয় এবং কোনো আয়ন বা মুক্ত ইলেকট্রন সৃষ্টি করে না, তাই কঠিন বা দ্রবণ কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুৎ পরিবহন করে না।