আয়নিক ও সমযোজী বন্ধন: খাদ্য লবণ ও ক্লোরিন গ্যাস
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
আমাদের রান্নায় প্রতিদিন ব্যবহৃত খাদ্য লবণে (NaCl) একটি সোডিয়াম পরমাণু (Na, বহিঃস্থ স্তরে ১টি ইলেকট্রন) তার যোজ্যতা ইলেকট্রনটি ক্লোরিন পরমাণুকে (Cl, বহিঃস্থ স্তরে ৭টি ইলেকট্রন) পুরোপুরি দান করে। ফলে Na⁺ ক্যাটায়ন ও Cl⁻ অ্যানায়ন তৈরি হয়ে স্থির বৈদ্যুতিক আকর্ষণে আয়নিক বন্ধন গঠন করে। অন্যদিকে পানি জীবাণুমুক্তকরণে ব্যবহৃত ক্লোরিন গ্যাসে (Cl₂) দুটিই ক্লোরিন পরমাণু (অধাতু) এবং উভয়েরই শেষ কক্ষপথে ৭টি করে ইলেকট্রন রয়েছে। এখানে কোনো পরমাণুই ইলেকট্রন ছেড়ে দিতে পারে না। দুটি ক্লোরিন পরমাণু যুক্ত হয়ে Cl₂ অণু গঠনের সময় এদের মধ্যে কোন ধরনের রাসায়নিক বন্ধন তৈরি হয়?
দুটি ক্লোরিন পরমাণু (Cl ও Cl) যুক্ত হয়ে Cl₂ অণু গঠনের সময় কোন ধরনের বন্ধন তৈরি হয়?
- আয়নিক বন্ধন — একটি Cl পরমাণু অপর Cl-কে ১টি ইলেকট্রন দান করে Na ও Cl-এর মতো ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন তৈরি করে
- সমযোজী বন্ধন — উভয় Cl পরমাণু ১টি করে ইলেকট্রন সরবরাহ করে ১ জোড়া ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে অষ্টক পূর্ণ করে
- কোনো প্রকৃত বন্ধন গঠিত হয় না — ধাতু ছাড়া ইলেকট্রন ত্যাগ সম্ভব নয় বলে পরমাণু দুটি কেবল দুর্বল আকর্ষণে একসাথে থাকে
যা বদলাতে পারবে
- ১ম মৌল: সোডিয়াম (Na), ক্লোরিন (Cl), হাইড্রোজেন (H), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), অক্সিজেন (O)
- ২য় মৌল: ক্লোরিন (Cl), সোডিয়াম (Na), হাইড্রোজেন (H), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), অক্সিজেন (O)
যা মেপে দেখাবে
- রাসায়নিক সংকেত
- বন্ধনের ধরন
- তড়িৎ ঋণাত্মকতার পার্থক্য (Δχ)
- গলিত অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবাহী
চালানোর সময় খেয়াল করো
- ১ম মৌলটি পরিবর্তন করে ক্লোরিন (Cl) নির্বাচন করো, যাতে দুটি পরমাণুই ক্লোরিন হয়। পরমাণু দুটির মধ্যে কি ইলেকট্রন আদান-প্রদান হচ্ছে, নাকি ইলেকট্রন শেয়ার হচ্ছে?
- তড়িৎ ঋণাত্মকতার পার্থক্য (Δχ) এবং বন্ধনের ধরন লক্ষ্য করো। ধাতু ও অধাতুর (Na + Cl) বন্ধনের সাথে দুটি অধাতুর (Cl + Cl) বন্ধনের কী পার্থক্য দেখলে?
নিজে করে দেখো
- এমন একটি আয়নিক যৌগ তৈরি করো যার সংকেতে অধাতুর দুটি পরমাণু থাকে (যেমন সমুদ্রের পানির MgCl₂)।
ইঙ্গিত
Mg দুটি ইলেকট্রন ছাড়ে, প্রতিটি Cl একটি নেয়।
- দুটি ভিন্ন অধাতু দিয়ে এমন একটি যৌগ তৈরি করো যেখানে ইলেকট্রন ভাগাভাগি হয় কিন্তু সমানভাবে নয় (পোলার সমযোজী)।
ইঙ্গিত
দুটি পরমাণুর তড়িৎ ঋণাত্মকতার পার্থক্য দেখো।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
আয়নিক ও সমযোজী বন্ধন: ইলেকট্রন স্থানান্তর বনাম ইলেকট্রন শেয়ার
পরমাণুসমূহ তাদের সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে নিকটস্থ নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো স্থিতিশীল অষ্টক বা দ্বৈত ইলেকট্রন বিন্যাস অর্জনের জন্য রাসায়নিক বন্ধন গঠন করে। যখন ধাতু ও অধাতু পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়, তখন ধাতু তার যোজ্যতা ইলেকট্রন ত্যাগ করে ক্যাটায়নে এবং অধাতু সেই ইলেকট্রন গ্রহণ করে অ্যানায়নে পরিণত হয়; এই বিপরীত আধানযুক্ত আয়নগুলোর মধ্যে স্থির বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বলের মাধ্যমে আয়নিক বন্ধন গঠিত হয় (যেমন: NaCl-এ Na ১টি ইলেকট্রন Cl-কে দান করে)। কিন্তু যখন দুটি অধাতব পরমাণু পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়, তখন কোনো পরমাণুই ইলেকট্রন ছেড়ে দিতে পারে না। তখন উভয় পরমাণু প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইলেকট্রন সরবরাহ করে ইলেকট্রন জোড় তৈরি করে এবং তা সমানভাবে শেয়ার বা ভাগাভাগি করে সমযোজী বন্ধন গঠন করে (যেমন: Cl₂ অণুতে দুটি ক্লোরিন পরমাণু প্রত্যেকে ১টি করে ইলেকট্রন দিয়ে ১ জোড়া ইলেকট্রন শেয়ার করে অষ্টক পূর্ণ করে)।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করে যে সকল রাসায়নিক বন্ধনেই একটি পরমাণু থেকে অন্যটিতে ইলেকট্রন আদান-প্রদান হতে হবে অথবা ধাতু না থাকলে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি হতে পারে না। ক্লোরিন একটি অধাতু যার তড়িৎ ঋণাত্মকতা অনেক বেশি (৩.১৬) এবং আয়নীকরণ শক্তিও উচ্চ। তাই একটি ক্লোরিন পরমাণুর পক্ষে অন্য ক্লোরিন থেকে ইলেকট্রন কেড়ে নেওয়া বা ইলেকট্রন ত্যাগ করা সম্ভব নয়। ফলে দুটি ক্লোরিন পরমাণু ইলেকট্রন আদান-প্রদান না করে প্রত্যেকে ১টি করে ইলেকট্রন সরবরাহ করে একটি বন্ধনজোড় ইলেকট্রন গঠন করে এবং তা সমানভাবে শেয়ারের মাধ্যমে শক্তিশালী সমযোজী বন্ধন গঠন করে Cl₂ অণু তৈরি করে।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- সব রাসায়নিক বন্ধনেই পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনের সম্পূর্ণ আদান-প্রদান (ত্যাগ ও গ্রহণ) ঘটে
- ধাতু না থাকলে বা ইলেকট্রন ত্যাগ না করলে পরমাণুগুলোর মধ্যে শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধন তৈরি হতে পারে না
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- কক্সবাজারের সামুদ্রিক লবণ শিল্প ও খাবার স্যালাইন তৈরি — কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও টেকনাফের লবণ মাঠে সমুদ্রের পানি বাষ্পীভূত করে অপরিশোধিত সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) তৈরি করা হয়। আয়নিক যৌগ হিসেবে NaCl উচ্চ গলনাঙ্কবিশিষ্ট ও পানিতে সম্পূর্ণ দ্রবণীয়। খাবার স্যালাইনে Na⁺ ও Cl⁻ আয়ন দ্রবীভূত অবস্থায় মানবদেহে তরল ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতি বছর ডায়রিয়া ও কলেরার হাত থেকে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করে।
- ওয়াসা (WASA) ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি বিশুদ্ধকরণে ক্লোরিন গ্যাস — সমযোজী যৌগ হিসেবে ক্লোরিন গ্যাস (Cl₂) সাধারণ তাপমাত্রায় দ্বিপরমাণুক গ্যাসীয় অণু। ঢাকা ওয়াসা ও দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় সরবরাহকৃত সুপেয় পানিতে থাকা রোগজীবাণু ধ্বংস করতে ক্লোরিন গ্যাস (Cl₂) ও ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে ক্লোরিনেশন করা হয়; ক্লোরিন পানির সাথে বিক্রিয়া করে হাইপোক্লোরাস অ্যাসিড তৈরি করে যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে।