মাতা-পিতার আকৃতি ও প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় সন্তান-সন্ততিতে সঞ্চারিত হওয়াকে বংশগতি বলে। এখানে আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য বলতে দেহের গঠনসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য বোঝায়।
ক্রোমোজোম বংশগতির প্রধান বাহক। নিউক্লিয়াসের নিউক্লিওপ্লাজমে সুতার মতো ছড়িয়ে থাকা বস্তু হলো ক্রোমাটিন। কোষ বিভাজনের সময় এই বস্তু ঘনীভূত হয়ে পৃথক ক্রোমোজোম হিসেবে স্পষ্ট দেখা যায়।
ডিএনএ বা ডি-অক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড ক্রোমোজোমের প্রধান উপাদান এবং বংশগতির রাসায়নিক বাহক। এটি বংশগতির তথ্য ধারণ করে। ১৯৫৩ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী ওয়াটসন ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ক্রিক ডিএনএর দ্বি-সর্পিল গঠন বর্ণনা করেন।
আরএনএ বা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড একটি নিউক্লিক অ্যাসিড। এটি সাধারণত একটি পলিনিউক্লিওটাইড সূত্রক দিয়ে গঠিত। অর্থাৎ অনেক নিউক্লিওটাইড পরপর যুক্ত হয়ে এর সূত্রক তৈরি করে।
জিন জীবের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের একক। এটি ক্রোমোজোমে অবস্থান করে; নির্দিষ্ট জিনের অবস্থানকে লোকাস বলে। বিভিন্ন জীবের জিনসংখ্যা এক নয়, তবে একই ধরনের জীবের জিনসংখ্যা মোটামুটি একই থাকে।
আগের একটি ডিএনএ অণু থেকে একই বংশগতির তথ্যবিশিষ্ট নতুন ডিএনএ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ডিএনএ প্রতিরূপ বা রেপ্লিকেশন বলে। কোষ বিভাজনের আগে ডিএনএর প্রতিলিপি তৈরি হয়। এর ফলে বিভাজনের পর নতুন কোষগুলো বংশগতির তথ্য পেতে পারে।
মানুষের সাধারণ দেহকোষে ৪৬টি বা ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। এর মধ্যে ২২ জোড়া, অর্থাৎ ৪৪টি হলো অটোজোম। এগুলো দেহগঠন, ভ্রূণের বিকাশ ও শারীরবৃত্তীয় কাজে ভূমিকা রাখে।
জিনের পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বংশগত সমস্যাকে জেনেটিক ডিসঅর্ডার বলা হয়। জিনের পরিবর্তন হলো মিউটেশন। জিন বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে বলে তার পরিবর্তন কোনো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
বর্ণান্ধতা হলো এমন অবস্থা, যেখানে কোনো ব্যক্তি কিছু রং স্বাভাবিকভাবে চিনতে বা আলাদা করতে পারেন না। চোখে রং শনাক্ত করার জন্য বিশেষ রঞ্জক পদার্থ থাকে। এসব রঞ্জকের ঘাটতি বা ত্রুটি হলে রং চেনায় সমস্যা হয়।
থ্যালাসেমিয়া হলো বংশগত রক্তরোগ, যাতে ত্রুটিপূর্ণ লোহিত রক্তকোষ তৈরি হয়ে সহজে ভেঙে যায়। ফলে রোগী রক্তশূন্যতা, অর্থাৎ রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক পরিমাণ কমে যাওয়ার সমস্যায় ভোগে।
জৈব অভিব্যক্তি, বিবর্তন বা ইভোলিউশন হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জীবসমষ্টির বংশগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন। দীর্ঘকাল ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় পূর্বপুরুষের জীব থেকে বর্তমানের বৈচিত্র্যময় জীবজগৎ গড়ে উঠেছে।
পৃথিবীতে জীবের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত অনুমান এরকম। আদি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড, জলীয় বাষ্প, নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ছিল, কিন্তু অক্সিজেন ছিল না।
একই প্রজাতির সদস্যদের বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যকে প্রকরণ, ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য বলে। একই প্রজাতির জীবের অনেক মিল থাকলেও সব সদস্য হুবহু একরকম হয় না। পার্থক্যটি কখনো সহজে চোখে পড়ে, আবার কখনো খুব সামান্য হয়।
অত্যধিক প্রজননের প্রবণতা হলো জীবের এমন স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, যার ফলে পরিবেশে শেষ পর্যন্ত যত সদস্য টিকে থাকতে পারে, তার তুলনায় অনেক বেশি সন্তান উৎপন্ন হয়।
সীমিত খাদ্য, আশ্রয় এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য জীবের যে প্রতিযোগিতা ও বাধা অতিক্রমের প্রয়োজন হয়, তাকে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম বলে। জীব অনেক সন্তান উৎপন্ন করলেও পরিবেশ সবার চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
প্রাকৃতিক নির্বাচন হলো এমন প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো পরিবেশে সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্যযুক্ত জীব অন্যদের তুলনায় বেশি সফলভাবে টিকে থাকে ও বংশবিস্তার করে। ফলে তাদের কিছু বংশগত বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে বেশি দেখা যায়।
কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশে যে জীবের বৈশিষ্ট্য তাকে অন্যদের তুলনায় ভালোভাবে বেঁচে থাকতে ও বংশবিস্তার করতে সাহায্য করে, তাকে সেই পরিবেশের জন্য যোগ্যতম বলা হয়।
জৈব অভিব্যক্তির পক্ষে বিজ্ঞানীরা যেসব প্রমাণ পেয়েছেন, তার প্রধানগুলো এই। সমসংস্থ অঙ্গ: পাখির ডানা, বাদুড়ের ডানা, তিমির ফ্লিপার, ঘোড়ার অগ্রপদ ও মানুষের হাত দেখতে আলাদা, কিন্তু এদের অস্থিবিন্যাসের মৌলিক গঠন একই ধরনের।
পরিবেশ সবসময় একরকম থাকে না। খাদ্যের প্রাপ্যতা, আবহাওয়া, বাসস্থান ও অন্য জীবের সঙ্গে সম্পর্ক বদলালে টিকে থাকার শর্তও বদলে যায়। অভিযোজন হলো পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়া।
ফরিদপুরের বাসিন্দা রহিম ও সালমা দম্পতির দুই বছর বয়সী শিশুসন্তান রক্তশূন্যতা, শারীরিক দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দায় ভুগছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানালেন শিশুটি থ্যালাসমিয়া মেজর (Thalassemia Major) রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসক অভিভাবকদ্বয়কে বোঝালেন যে রহিম ও সালমা উভয়েই জন্মগতভাবে থ্যালাসমিয়ার আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ বাহক (Thalassemia Minor) হওয়ায় তাদের সন্তানের এই মারাত্মক রোগটি হয়েছে। চিকিৎসক আরো বললেন, দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে পরিহার করতে পারলে সমাজ থেকে এ রোগ সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব।
ক
জিন (Gene) কী?
উত্তর দেখাও
ক্রোমোজোমে অবস্থিত জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক এবং কার্যকর মৌলিক একককে জিন বলে।
খ
ডিএনএ প্রতিরূপ সৃষ্টিকে (replication) অর্ধ-রক্ষণশীল পদ্ধতি বলা হয় কেন?
উত্তর দেখাও
ডিএনএ প্রতিরূপ সৃষ্টির সময় মাতৃ ডিএনএ হেলিক্সের দুটি সূত্র পৃথক হয়ে যায় এবং প্রতিটি পুরাতন সূত্র নতুন পরিপূরক সূত্র তৈরির জন্য ছাঁচ (template) হিসেবে কাজ করে। ফলে উৎপন্ন প্রতিটি অপত্য ডিএনএ অণুর একটি সূত্র মাতৃ অণু থেকে আসা পুরাতন এবং অন্য সূত্রটি সম্পূর্ণ নতুন সংশ্লেষিত হয়। মাতৃ ডিএনএ-র অর্ধেক অংশ প্রতিটি নতুন অণুতে সংরক্ষিত থাকে বলেই একে অর্ধ-রক্ষণশীল প্রতিলিপন বলে।
গ
উদ্দীপকের দম্পতির পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে থ্যালাসমিয়া মেজর হওয়ার জিনতাত্ত্বিক সম্ভাবনা চেকারবোর্ডের (ক্রস ছক) মাধ্যমে নির্ণয় করো।
উত্তর দেখাও
থ্যালাসমিয়া একটি অটোজোমাল প্রচ্ছন্ন বংশগত রোগ। স্বাভাবিক অ্যালিলকে T এবং থ্যালাসমিয়ার প্রচ্ছন্ন অ্যালিলকে t ধরলে বাহক পিতা-মাতা উভয়ের জিনোটাইপ হবে Tt। জননকোষ (গ্যামিট) গঠনের সময় পিতা থেকে উৎপন্ন হয় T ও t শুক্রাণু এবং মাতা থেকে উৎপন্ন হয় T ও t ডিম্বাণু। এদের মধ্যে সম্ভাব্য মিলনে চেকারবোর্ড অনুযায়ী জিনোটাইপগুলো হবে: T×T→TT (২৫% হোমোজাইগাস স্বাভাবিক সুস্থ), T×t→Tt (৫০% হেটারোজাইগাস স্বাভাবিক কিন্তু বাহক), এবং t×t→tt (২৫% হোমোজাইগাস প্রচ্ছন্ন থ্যালাসমিয়া মেজর আক্রান্ত)। অতএব, উদ্দীপকের দম্পতির পরবর্তী সন্তানের থ্যালাসমিয়া মেজর (tt) নিয়ে জন্মগ্রহণের সম্ভাবনা হলো ৪১ অংশ বা ২৫%।
ঘ
"থ্যালাসমিয়ার বিস্তার রোধে বিবাহপূর্ব রক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ"— উদ্দীপক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখাও
উক্তিটি অত্যন্ত যথার্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে বাস্তবসম্মত। প্রথমত, থ্যালাসমিয়া রক্তের একটি বংশগত অটোজোমাল প্রচ্ছন্ন রোগ; একক প্রচ্ছন্ন জিন বহনকারী ব্যক্তিরা (থ্যালাসমিয়া মাইনর) বাহ্যিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকায় নিজের অজান্তেই বাহক হন। কিন্তু উদ্দীপকের মতো দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে প্রতি গর্ভধারণে ২৫% ঝুঁকি থাকে শিশু থ্যালাসমিয়া মেজরে আক্রান্ত হওয়ার। দ্বিতীয়ত, একজন বাহক যদি একজন স্বাভাবিক সুস্থ (নন-ক্যারিয়ার) ব্যক্তিকে বিয়ে করেন, তবে সন্তানদের কেউ কেউ বাহক হলেও কোনো সন্তানই থ্যালাসমিয়া মেজরে আক্রান্ত হবে না। তৃতীয়ত, থ্যালাসমিয়া মেজর আক্রান্ত শিশুর দেহে স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন গঠিত না হওয়ায় তাকে প্রতি মাসে এক বা একাধিক ব্যাগ রক্ত দিতে হয় এবং অতিরিক্ত আয়রন অপসারণে ব্যয়বহুল চিলেশন থেরাপি নিতে হয়, যার ফলে সাধারণ পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ে এবং শিশুটি অসহনীয় যন্ত্রণায় ভোগে। চতুর্থত, থ্যালাসমিয়ার স্থায়ী নিরাময় যেমন অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রতিরোধই একমাত্র মুক্তির উপায়। বিয়ের পূর্বে একটি সাধারণ হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস রক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করে দুজন বাহকের বিয়ে প্রতিহত করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে থ্যালাসমিয়া মেজরের প্রাদুর্ভাব শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। সুতরাং, একটি থ্যালাসমিয়ামুক্ত সুস্থ সমাজ গঠনে বিবাহপূর্ব রক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।