সবুজ ধানের ক্ষেতে প্রাকৃতিক নির্বাচন: ঘাসফড়িংয়ের অভিযোজন
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
ময়মনসিংহের একটি সবুজ আমন ধানের ক্ষেতে ঘাসফড়িংয়ের একটি দল বাস করে। শুরুতে প্রকরণ হিসেবে দলের মাত্র ২০% (০.২০) ঘাসফড়িং ছিল সবুজ এবং বাকি ৮০% (০.৮০) ছিল বাদামি। সবুজ ধানের পাতায় সবুজ রঙের ফড়িং মিশে থাকে (ছদ্মবেশ বা ক্যামোফ্লেজ), তাই ফিঙে ও শালিক পাখি সহজে তাদের দেখতে পায় না। ফলে প্রতি প্রজন্মে সবুজ ঘাসফড়িংয়ের বেঁচে থাকার হার ০.৮ (৮০%)। অন্যদিকে বাদামি ঘাসফড়িং সবুজ পাতার ওপর সহজে চোখে পড়ে বলে প্রতি প্রজন্মে তাদের বেঁচে থাকার হার মাত্র ০.৪ (৪০%)। অনুকূল প্রকরণের এই বেঁচে থাকার সুবিধার কারণে ৪ প্রজন্ম পর ঘাসফড়িংয়ের দলটিতে সবুজ ঘাসফড়িংয়ের প্রত্যাশিত অনুপাত কত হবে?
প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে ৪ প্রজন্ম পর ঘাসফড়িংয়ের দলটিতে সবুজ ঘাসফড়িংয়ের প্রত্যাশিত অনুপাত কত হবে?
- ০.৮০ (বা ৮০%): চার প্রজন্মে সবুজ রঙের সুবিধার কারণে তাদের অনুপাত বেড়ে ৮০% হবে
- ০.২০ (বা ২০%): শুরুতে যা ছিল সবসময় তাই থাকবে, প্রজন্মান্তরে অনুপাত বদলায় না
- ০.৫০ (বা ৫০%): দুই ধরনের ফড়িং সময়ের সাথে সমান ভাগে (৫০% : ৫০%) ভাগ হয়ে যাবে
যা বদলাতে পারবে
- বাদামি ঘাসফড়িংয়ের বেঁচে থাকার হার: ০.১ থেকে ০.৯
- প্রজন্ম সংখ্যা: ০ থেকে ২০
যা মেপে দেখাবে
- সবুজ ফড়িংয়ের প্রত্যাশিত অনুপাত
- নমুনায় পর্যবেক্ষিত সবুজ অনুপাত
চালানোর সময় খেয়াল করো
- প্রজন্ম সংখ্যা বাড়িয়ে ৪ করো। সবুজ ফড়িং শিকারির হাত থেকে বাঁচার বাড়তি সুবিধা পেলে কয়েক প্রজন্ম পর তাদের অনুপাত বেড়ে কত হয় দেখো।
নিজে করে দেখো
- ধানের ক্ষেতে শিকারি পাখির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাদামি ফড়িংয়ের বেঁচে থাকার হার কমে ০.২ হলো। ৬ প্রজন্মের মধ্যে সবুজ ফড়িংয়ের প্রত্যাশিত অনুপাত অন্তত ০.৯৫ (৯৫%) এ উন্নীত করো।
ইঙ্গিত
বাদামি ফড়িংয়ের বেঁচে থাকার হার ০.২ এ নামিয়ে আনো এবং প্রজন্ম সংখ্যা বাড়াও। শিকারের চাপ বেশি হলে প্রাকৃতিক নির্বাচন অনেক দ্রুত ঘটে।
- আমন ধান পেকে খড় বা বাদামি রঙের হয়ে গেলে উভয় রঙের ফড়িং সমান সুবিধা পায়। বাদামি ফড়িংয়ের বেঁচে থাকার হার বাড়িয়ে ০.৮ করো এবং অন্তত ৮ প্রজন্ম পরেও সবুজ ফড়িংয়ের প্রত্যাশিত অনুপাত আদি মান ০.২০ এ স্থির রাখো।
ইঙ্গিত
উভয়ের বেঁচে থাকার হার সমান (০.৮) হলে কারো বাড়তি সুবিধা থাকে না, ফলে প্রজন্মান্তরে অনুপাত বদলায় না।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদ: অনুকূল বৈশিষ্ট্যের বিস্তার ও যোগ্যতমের টিকে থাকা
চার্লস ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব অনুসারে, একই প্রজাতির বিভিন্ন জীবের মধ্যে জিনগত কারণে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য বা প্রকরণ (variation) দেখা যায়। সবুজ ধানক্ষেতে সবুজ রঙের ঘাসফড়িং প্রকৃতির পটভূমির সাথে মিশে থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে, যা ছদ্মবেশ (camouflage) নামে পরিচিত। এর ফলে শিকারি পাখির হাত থেকে এদের বেঁচে থাকার ও বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাদামি ফড়িংয়ের চেয়ে দ্বিগুণ (০.৮ বনাম ০.৪) হয়। একেই ডারউইন জীবন সংগ্রাম এবং যোগ্যতমের টিকে থাকা (survival of the fittest) বলে অভিহিত করেছেন। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বাদামি ঘাসফড়িং বেশি সংখ্যায় মারা পড়ে, ফলে প্রতি প্রজন্মে সবুজ ঘাসফড়িংয়ের অনুপাত ক্রমশ বাড়তে থাকে। মাত্র ৪ প্রজন্মের মধ্যেই সবুজ ফড়িংয়ের অনুপাত ২০% থেকে বেড়ে ৮০%-এ পৌঁছে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে অনুকূল বৈশিষ্ট্যের এই প্রাকৃতিক নির্বাচনই শেষ পর্যন্ত জীবজগতের বিবর্তন ঘটায়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
জনসংখ্যায় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অনুপাত কখনোই অপরিবর্তিত থাকে না যদি কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের বেঁচে থাকার বাড়তি সুবিধা থাকে। বাদামি ফড়িংয়ের চেয়ে সবুজ ফড়িং দ্বিগুণ হারে বেঁচে থাকলে প্রজন্মান্তরে সবুজ রঙের জিন বেশি সংখ্যায় পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। আবার প্রকৃতিতে নির্বাচন ভারসাম্য কোনো ইচ্ছাকৃত ৫০% : ৫০% সমবণ্টন মানে না: যে প্রকরণটি পরিবেশের সাথে বেশি খাপ খায়, প্রকৃতি ক্রমাগত তাকেই নির্বাচন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ করে তোলে।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপ থাকা সত্ত্বেও জীবগোষ্ঠীতে অনুকূল ও প্রতিকূল বৈশিষ্ট্যের অনুপাত প্রজন্মান্তরে অপরিবর্তিত থাকে
- দুই ধরনের প্রকরণ থাকলে বেঁচে থাকার পার্থক্য উপেক্ষা করে সময়ের সাথে তাদের অনুপাত সমান সমান (৫০% : ৫০%) হয়ে যায়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর তথ্যমতে ধানের ক্ষতিকর কারেন্ট পোকা (বাদামি গাছফড়িং)-এর ওপর অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে কীটনাশক-প্রতিরোধী ফড়িংদের প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটে, যা পরবর্তী প্রজন্মে কীটনাশক অকার্যকর করে তোলে
- ঢাকা ও অন্যান্য শহরে ডেঙ্গু প্রতিরোধী মশক নিধন কার্যক্রমে কীটনাশকের বিরুদ্ধে এডিস মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি বাস্তব উদাহরণ