ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার একজন বাণিজ্যিক মাছ চাষি রফিকুল ইসলাম তাঁর খামারের দুটি পুকুরের পানির গুণাগুণ পরীক্ষার জন্য উপজেলা মৎস্য গবেষণাগারে নমুনা নিয়ে যান। ল্যাব কর্মকর্তা ডিজিটাল pH মিটার ব্যবহার করে দেখলেন:
- ১ম পুকুরের পানির pH = ৪.০
- ২য় পুকুরের পানির pH = ৭.৫ রফিকুল ইসলাম ১ম পুকুরের অম্লত্ব দূর করে মাছ চাষের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি শতকে নির্দিষ্ট হারে চুন বা ক্যালসিয়াম অক্সাইড (CaO) প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন।
- ক
pH কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
কোনো জলীয় দ্রবণে উপস্থিত হাইড্রোজেন আয়নের মোলার ঘনমাত্রার ঋণাত্মক লগারিদমকে ওই দ্রবণের pH বলে (অর্থাৎ pH = −log₁₀[H⁺])।
- খ
কৃষি জমির মাটির pH মান ৩ এর নিচে নেমে গেলে ফসল উৎপাদনের কী ধরনের ক্ষতি হয়? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
মাটির pH মান ৩ এর নিচে নেমে গেলে মাটি অত্যন্ত অম্লীয় হয়ে পড়ে। এর ফলে মাটিতে ফসলের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উপকারী অণুজীব ও নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায় এবং ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাসের মতো অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো উদ্ভিদের গ্রহণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ ফসলের শিকড়ের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
- গ
উদ্দীপকের ১ম পুকুরের পানিতে হাইড্রোজেন আয়নের মোলার ঘনমাত্রা [H⁺] নির্ণয় করো এবং আদর্শ নিরপেক্ষ পানির হাইড্রোজেন আয়নের ঘনমাত্রার সাথে এর অনুপাত বের করো।
উত্তর দেখাও
১. ১ম পুকুরের পানিতে [H⁺] নির্ণয়: আমরা জানি, pH = −log₁₀[H⁺] বা, [H⁺] = ১০⁻ᵖᴴ mol/L উদ্দীপকে ১ম পুকুরের পানির pH = ৪.০। অতএব, ১ম পুকুরের পানিতে [H⁺] = ১০⁻⁴ mol/L = ০.০০০১ mol/L।
২. নিরপেক্ষ পানির [H⁺] নির্ণয়: আদর্শ নিরপেক্ষ পানির pH = ৭.০। অতএব, নিরপেক্ষ পানিতে [H⁺] = ১০⁻⁷ mol/L।
৩. ঘনমাত্রার অনুপাত নির্ণয়: ১ম পুকুরের [H⁺] ও নিরপেক্ষ পানির [H⁺] এর অনুপাত = ১০⁻⁴ ⁄ ১০⁻⁷ = ১০⁽⁻⁴ ⁺ ⁷⁾ = ১০³ = ১,০০০।
সুতরাং, ১ম পুকুরের পানিতে হাইড্রোজেন আয়নের ঘনমাত্রা আদর্শ নিরপেক্ষ পানির ঘনমাত্রার চেয়ে ১,০০০ গুণ বেশি।
- ঘ
১ম পুকুরে রফিকুল ইসলামের চুন (CaO) প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি মৎস্য উৎপাদন ও রাসায়নিক পরিবর্তনের আলোকে কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল? সমীকরণসহ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
১ম পুকুরে রফিকুল ইসলামের চুন (CaO) প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও বিজ্ঞানসম্মত ছিল। নিচে এর কারণ ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. অম্লীয় পানির বিরূপ প্রভাব: মাছের সুস্থ বেঁচে থাকা ও দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পানির অনুকূল pH হলো ৬.৫ থেকে ৮.৫ (উদ্দীপকের ২য় পুকুরের pH ৭.৫ যা আদর্শ)। কিন্তু ১ম পুকুরের পানির pH মাত্র ৪.০, যা অত্যন্ত অম্লীয়। অতিরিক্ত অম্লীয় পানিতে মাছের রক্তে অ্যাসিডোসিস ঘটে, ফুলকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং প্রাকৃতিক খাদ্য প্লাঙ্কটনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে মাছের মৃত্যু ঘটতে পারে।
২. চুনের রাসায়নিক ক্রিয়া: পুকুরে পোড়াচুন বা ক্যালসিয়াম অক্সাইড (CaO) প্রয়োগ করলে তা পানির সাথে তীব্রভাবে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [Ca(OH)₂] উৎপন্ন করে: CaO + H₂O → Ca(OH)₂
৩. প্রশমন বিক্রিয়া ও pH নিয়ন্ত্রণ: উৎপন্ন Ca(OH)₂ একটি তীব্র ক্ষারকীয় পদার্থ হওয়ায় তা পানিতে বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোক্সাইড (OH⁻) আয়ন দেয়। এই OH⁻ আয়ন পুকুরের অম্লীয় H⁺ আয়নের সাথে প্রশমন বিক্রিয়া ঘটিয়ে পানি উৎপন্ন করে: Ca(OH)₂ + 2H⁺ → Ca²⁺ + 2H₂O এর ফলে পানির অতিরিক্ত H⁺ প্রশমিত হয়ে পানির pH দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে মাছের জন্য অনুকূল নিরপেক্ষ মাত্রায় (৭–৮) ফিরে আসে।
৪. অতিরিক্ত পরিবেশগত সুবিধা: চুন প্রয়োগের ফলে মুক্ত হওয়া ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca²⁺) মাছের হাড় ও আঁশ গঠনে সহায়ক এবং তা তলানির বিষাক্ত গ্যাস ও অম্লকে নিষ্ক্রিয় করে খামারের পরিবেশ সুস্থ রাখে।
অতএব, ১ম পুকুরের পানির অম্লত্ব কমিয়ে মাছের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে রফিকুল ইসলামের চুন প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী ও সম্পূর্ণ সঠিক ছিল।