উদ্ভিদে সমন্বয় হলো উদ্ভিদের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের মধ্যে এমন নিয়ন্ত্রণ ও সামঞ্জস্য, যার ফলে কাজগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়। একটি গাছে একই সময়ে শ্বসন, বিপাক, বৃদ্ধি এবং অন্যান্য কাজ চলে।
বৃদ্ধি হলো উদ্ভিদ বা তার কোনো অংশের আকার ও ভরের স্থায়ী বৃদ্ধি। কোষ বিভাজনের ফলে কোষের সংখ্যা বাড়ে এবং কোষ বড় হওয়ার ফলে অঙ্গের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বাড়ে। মূল ও কাণ্ডের অগ্রভাগের বর্ধনশীল অঞ্চলে এ কাজ বেশি সক্রিয়।
চলন হলো উদ্দীপনার প্রভাবে জীব বা তার কোনো অংশের অবস্থানের পরিবর্তন। উদ্ভিদও বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা অনুভব করে সাড়া দিতে পারে। আলো, মাধ্যাকর্ষণ ও স্পর্শ উদ্ভিদের চলনের পরিচিত উদ্দীপক।
প্রাণীর সমন্বয় হলো দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও শারীরবৃত্তীয় কাজের মধ্যে সংযোগ, নিয়ন্ত্রণ এবং সামঞ্জস্য বজায় রাখা। হাঁটা, বসা, কথা বলা, চিন্তা করা, হাসা বা খাওয়ার সময় অনেক অঙ্গ একসঙ্গে কাজ করে।
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্ক ও সুষুম্না কাণ্ড নিয়ে গঠিত। মস্তিষ্ক করোটির ভেতরে এবং সুষুম্না কাণ্ড মেরুদণ্ডের ভেতরে সুরক্ষিত থাকে। এই ব্যবস্থা তথ্য গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ ও দেহের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
নিউরন হলো স্নায়ুতন্ত্রের গাঠনিক ও কার্যগত একক। এটি উদ্দীপনা গ্রহণ এবং স্নায়ুবার্তা পরিবহণ করে। অনেক নিউরন মিলে স্নায়ুটিস্যু গঠন করে। একটি নিউরনের গঠন প্রধানত দুটি ভাগে বোঝা যায়: কোষদেহ এবং প্রলম্বিত অংশ।
আবেগ সঞ্চালন হলো স্নায়ুতন্ত্রে স্নায়ুবার্তা বা সংকেত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া। এখানে স্নায়ু আবেগ বলতে অনুভূতির উত্তেজনা নয়, উদ্দীপনার ফলে সৃষ্টি হওয়া স্নায়ুসংকেত বোঝায়।
প্রাণরস বা হরমোন হলো অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ, যা রক্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোষে পৌঁছে দেহের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি বা নালিবিহীন গ্রন্থির ক্ষরণ পরিবহণের জন্য আলাদা নালি নেই।
দেহের প্রয়োজনের তুলনায় কোনো হরমোন কম বা বেশি নিঃসৃত হওয়ার ফলে যে শারীরিক গোলযোগ দেখা দেয়, তাকে হরমোনজনিত অস্বাভাবিকতা বলে। হরমোন অল্প পরিমাণে কাজ করলেও বৃদ্ধি, বিপাক এবং অঙ্গের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।
গলার সামনে শ্বাসনালির উপরের অংশে অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন নিঃসৃত হয়। থাইরক্সিন দেহের বৃদ্ধি ও বিপাকের হার নিয়ন্ত্রণ করে। বিপাক হলো কোষে সংঘটিত বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমষ্টি।
অগ্ন্যাশয়ের আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স নামের কোষগুচ্ছ থেকে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন শর্করার বিপাক এবং রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করে। খাবার হজমের পর গ্লুকোজ রক্তে আসে।
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাতের ফলে স্নায়ুতন্ত্রের কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়াকে স্ট্রোক বলে। মস্তিষ্কের কোষ রক্ত থেকে অক্সিজেন ও পুষ্টি পায়। সরবরাহ ব্যাহত হলে কোষ স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত হতে পারে।
স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে স্নায়ুতন্ত্রের কাজে ব্যাঘাত ঘটা। এর কারণ ও লক্ষণের সম্পর্ক বুঝতে মনে রাখতে হবে, মস্তিষ্ক দেহের চলাফেরা ও কথা বলাসহ বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
স্ট্রোক হলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের ব্যাঘাতে স্নায়ুকোষের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তাৎক্ষণিক করণীয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো রোগীকে নিরাপদ রাখা এবং যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
স্ট্রোক প্রতিরোধ বলতে মস্তিষ্কের রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা বোঝায়। সব স্ট্রোক নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যায় না, তবে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং বিদ্যমান রোগের চিকিৎসা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
দেহের কোনো অংশের অনুভূতি এবং ঐচ্ছিক পেশির চলনশক্তি হারিয়ে যাওয়াকে প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত বলে। ঐচ্ছিক পেশি হলো ইচ্ছামতো নাড়ানো যায় এমন পেশি, যেমন হাত-পায়ের অনেক পেশি।
এপিলেপসি (মৃগীরোগ বা মূর্ছারোগ) হলো মস্তিষ্কের একটি রোগ, যাতে খিঁচুনি দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগী সংজ্ঞা হারান। খিঁচুনি বলতে দেহের পেশির অনিচ্ছাকৃত সংকোচন ও ঝাঁকুনিকে বোঝায়।
পারকিনসন রোগ হলো মস্তিষ্কের একটি স্নায়ুবিক রোগ, যাতে কাঁপুনি, পেশির দৃঢ়তা এবং চলাফেরায় অসুবিধা দেখা দেয়। এটি সাধারণত ধীরে শুরু হয় এবং সময়ের সঙ্গে বাড়ে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি বিজ্ঞান ক্লাসের একটি প্রকল্পের জন্য দুটি ভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করল। প্রথম ঘটনায়, সে একটি টবে লাগানো সতেজ চারা গাছকে একটি অন্ধকার বাক্সে রাখল যার একপাশে একটিমাত্র ছিদ্র দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করত; এক সপ্তাহ পর দেখা গেল চারা গাছটির কাণ্ড আলোর উৎসের দিকে বেঁকে বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনায়, বিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে স্পিরিট ল্যাম্প নিয়ে কাজ করার সময় রাফির হাত অসাবধানতাবশত জ্বলন্ত শিখায় লাগামাত্র কোনো চিন্তা করার আগেই চোখের পলকে হাতটি আপনা-আপনি সরে এলো। পরে রাফি তার শিক্ষকের কাছে জানতে পারল যে, তার দাদার সম্প্রতি মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধে শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গিয়েছিল, যা কোনো হৃৎপিণ্ডের ব্যাধি নয় বরং মস্তিষ্কের একটি স্নায়বিক জটিলতা।
ক
সিন্যাপস (Synapse) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
দুটি পাশাপাশি অবস্থিত নিউরনের কার্যকরী সংযোগস্থলকে সিন্যাপস (synapse) বলে, যার মধ্য দিয়ে তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে স্নায়ু তাড়না পরিবাহিত হয়।
খ
স্ট্রোক হৃৎপিণ্ডের রোগ নয় বরং মস্তিষ্কের রোগ — ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে স্ট্রোক একটি হৃদরোগ, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুসারে এটি সম্পূর্ণরূপে মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধলে (ইসকেমিক স্ট্রোক) অথবা উচ্চ রক্তচাপের কারণে রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে (হেমোরেজিক স্ট্রোক) মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের স্নায়ুকোষে অক্সিজেন ও গ্লুকোজ সরবরাহ বন্ধ হয়ে কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়, যা স্ট্রোক নামে পরিচিত। অন্যদিকে, হৃৎপিণ্ডের নিজস্ব করোনারি ধমনিতে ব্লকেজ সৃষ্টি হয়ে হৃৎপেশির রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে তাকে হার্ট অ্যাটাক বলে, স্ট্রোক নয়।
গ
স্পিরিট ল্যাম্পের শিখা থেকে রাফির তাৎক্ষণিকভাবে হাত সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবর্তী প্রতিক্রিয়াটি (reflex action) একটি প্রবাহচিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
স্পিরিট ল্যাম্পের শিখা লাগামাত্র রাফির হাত সরিয়ে নেওয়া একটি সুষুম্নাকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত অনৈচ্ছিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া। একটি আদর্শ প্রতিবর্ত চক্রের ৫টি উপাদানের মাধ্যমে এটি সম্পন্ন হয়: ১. গ্রাহক অঙ্গ (ত্বক): রাফির আঙুলের ত্বকের তাপগ্রাহী স্নায়ুপ্রান্ত শিখার তীব্র উত্তাপ গ্রহণ করে স্নায়ু উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। ২. সংজ্ঞাবহ নিউরন (Sensory neuron): উৎপন্ন স্নায়ু তাড়নাকে আঙুল থেকে সুষুম্নাকাণ্ডের ধূসর অংশে পরিবহন করে নিয়ে যায়। ৩. প্রতিবর্ত কেন্দ্র (রিলে নিউরন): সুষুম্নাকাণ্ডে অবস্থিত রিলে নিউরন সংজ্ঞাবহ তাড়না গ্রহণ করে তাৎক্ষণিকভাবে তা চালক নিউরনে হস্তান্তর করে। ৪. চালক নিউরন (Motor neuron): সুষুম্নাকাণ্ড থেকে হাত সরানোর তড়িৎ-রাসায়নিক নির্দেশ বাহুর পেশিতে বহন করে। ৫. কারক অঙ্গ (বাহুর পেশি): নির্দেশ পাওয়ামাত্র দ্রুত সংকুচিত হয়ে হাতটিকে শিখা থেকে টেনে সরিয়ে আনে। প্রবাহচিত্র: গ্রাহক অঙ্গ (ত্বক) → সংজ্ঞাবহ নিউরন → সুষুম্নাকাণ্ড (রিলে নিউরন) → চালক নিউরন → কারক অঙ্গ (পেশির সংকোচন)।
ঘ
উদ্দীপকে উল্লিখিত চারা গাছটির আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যাওয়ার কারণ ফাইটোহরমোন ও কোষের অসম বৃদ্ধির আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকে অন্ধকার বাক্সে রাখা চারা গাছটির আলোর উৎসের দিকে বেঁকে বৃদ্ধি পাওয়া হলো এক ধরনের ধনাত্মক বক্রচলন বা অনুকূল আলোকমুখী চলন (positive phototropism), যার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে অক্সিন (auxin) নামক ফাইটোহরমোন। বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ: প্রথমত, চারা গাছের কাণ্ডের শীর্ষে অবস্থিত ভাজক টিস্যুতে স্বাভাবিকভাবে অক্সিন হরমোন তৈরি হয় যা কোষ বিভাজন ও কোষের প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিতীয়ত, চার্লস ডারউইন ও অন্যান্য উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, অক্সিন আলোর উপস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় হয় কিংবা আলো থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন বা ছায়াযুক্ত অংশের দিকে স্থানান্তরিত হয়। ফলে বাক্সের একমুখী আলোর কারণে কাণ্ডের যে পাশে সরাসরি আলো পড়ে, তার চেয়ে বিপরীত ছায়াযুক্ত পাশে অক্সিনের ঘনত্ব অনেক বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, অক্সিন কোষের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। ছায়াযুক্ত অংশে অক্সিনের উচ্চ ঘনত্বের কারণে সেখানকার কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত ও অস্বাভাবিক দীর্ঘায়িত হয়, অথচ আলোকিত পাশের কোষগুলোর বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে মন্থর থাকে। চতুর্থত, কাণ্ডের দুই পাশের এই অসম বা বৈষম্যমূলক বৃদ্ধি (differential growth)-র ফলে ছায়াযুক্ত অংশটি দ্রুত প্রসারিত হয়ে আলোকিত অংশকে ঠেলে দেয় এবং চারা গাছটির কাণ্ডটি স্পষ্টভাবে আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায়। সুতরাং, একমুখী আলোর উপস্থিতিতে অক্সিনের অসম বিন্যাস এবং এর প্রভাবে কোষের অসম প্রসারণই এই আলোকমুখী বক্রচলনের মূল বৈজ্ঞানিক কারণ।