প্রতিবর্ত চক্র: উত্তপ্ত পাত্রে তাৎক্ষণিক সাড়া
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
একদিন রান্নাঘরে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়ার হাত চুলার ওপর থাকা উত্তপ্ত কড়াইতে লেগে গেল। কিন্তু তানিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের পলকে তার হাতটি আপনা-আপনি সরে এলো! একটি সরল প্রতিবর্ত চক্রের ৫টি প্রধান অংশ থাকে। তানিয়ার হাত সরানোর এই প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় সময় লাগল মাত্র ৫০ ms (০.০৫ s), অথচ মস্তিষ্কে সচেতনভাবে চিন্তা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে মানুষের সময় লাগে প্রায় ২৫০ ms। এই অতি দ্রুত প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় উত্তপ্ত কড়াই থেকে হাত সরানোর তাৎক্ষণিক নির্দেশটি আসলে কে দিয়েছিল?
গরম কড়াই স্পর্শ করার পর তাৎক্ষণিকভাবে হাত সরানোর নির্দেশটি আসলে কে দিয়েছিল?
- মস্তিষ্ক — স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে মস্তিষ্কে উদ্দীপনা পৌঁছানোর পর মস্তিষ্কই ভেবেচিন্তে হাত সরানোর নির্দেশ দেয়
- সুষুম্নাকাণ্ড — সুষুম্নাকাণ্ডের ইন্টারনিউরন তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেয়, মস্তিষ্ক সচেতনভাবে ভাবার আগেই হাত সরে যায়
- হাতের পেশি — তীব্র তাপে বাইসেপস পেশি কোনো স্নায়ুকেন্দ্রের নির্দেশ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজে নিজে সংকুচিত হয়
যা বদলাতে পারবে
- সমন্বয় পথ: প্রতিবর্ত চক্র (সুষুম্নাকাণ্ড), ঐচ্ছিক ক্রিয়া (মস্তিষ্ক)
- ধাপ: ১ থেকে ৫
যা মেপে দেখাবে
- বর্তমান পর্যায়
- প্রতিক্রিয়া সময় (ms)
- মোট পর্যায়
- অগ্রগতি (%)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- ধাপগুলো এগিয়ে ৩ নম্বর ধাপে যাও। লক্ষ্য করো সুষুম্নাকাণ্ডের ইন্টারনিউরন কীভাবে মস্তিষ্কের নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়।
নিজে করে দেখো
- সচেতন পথে কোন ধাপে সময় পুরো প্রতিবর্ত ক্রিয়ার (৫০ ms) চেয়ে বেশি হয়ে যায়? প্রথম এমন ধাপটি খুঁজে বের করো।
ইঙ্গিত
প্রতিটি ধাপের সময় দেখো।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
প্রতিবর্ত চক্র ও সুষুম্নাকাণ্ডের ভূমিকা: ৫টি উপাদানের সমন্বয়
প্রতিবর্তী ক্রিয়া (reflex action) হলো একটি অনৈচ্ছিক ও তাৎক্ষণিক শারীরিক সাড়া, যা সুষুম্নাকাণ্ড (spinal cord) দ্বারা পরিচালিত হয়। একটি সরল প্রতিবর্ত চক্রের ৫টি অংশ থাকে: (১) গ্রাহক অঙ্গ (receptor), (২) অনুভূতিবাহী বা সংবেদী স্নায়ু (sensory neuron), (৩) প্রতিবর্ত কেন্দ্র (reflex center), (৪) আজ্ঞাবাহী স্নায়ু (motor neuron) এবং (৫) কার্যকারক অঙ্গ (effector)। গরম পাত্রে হাত লাগলে সংবেদী স্নায়ু এই স্নায়ু তাড়না সুষুম্নাকাণ্ডে নিয়ে যায়। সুষুম্নাকাণ্ডের মধ্যবর্তী নিউরন বা ইন্টারনিউরন মস্তিষ্কের আদেশের অপেক্ষা না করে মাত্র ২৫ ms-এর মধ্যে আজ্ঞাবাহী স্নায়ুতে নির্দেশ পাঠায়, যার ফলে ৫০ ms-এর মধ্যে পেশি সংকুচিত হয়ে হাত সরে আসে। স্নায়ু তাড়নার একটি শাখা মস্তিষ্কেও যায়, তবে মস্তিষ্ক তাপ ও ব্যথার অনুভূতি সচেতনভাবে উপলব্ধি করার আগেই হাত নিরাপদ দূরত্বে সরে আসে। মস্তিষ্কে গিয়ে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে মানুষের প্রায় ২৫০ ms সময় লাগে, যা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বেশি সময় নেয়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকেরই ভুল ধারণা থাকে যে দেহের সমস্ত তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত মস্তিষ্কই গ্রহণ করে এবং ব্যথার অনুভূতি ভেবেচিন্তে হাত সরানোর নির্দেশ দেয়। প্রকৃতপক্ষে মস্তিষ্কে সচেতন চিন্তার পথ দীর্ঘ এবং এতে প্রায় ২৫০ ms বা তার বেশি সময় লাগে। মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে হাত সরাতে সরাতে আঙুলের চামড়া পুড়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হতো। সুষুম্নাকাণ্ড নিজেই এখানে একটি জরুরি ও স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। আবার কোনো স্নায়বিক উদ্দীপনা ছাড়া পেশিও নিজে নিজে সরাসরি সংকুচিত হতে পারে না; তাই সংবেদী স্নায়ু, সুষুম্নাকাণ্ড ও আজ্ঞাবাহী স্নায়ুর সমন্বয় ছাড়া প্রতিবর্ত ক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- প্রতিবর্ত ক্রিয়াসহ দেহের যাবতীয় কাজের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত মস্তিষ্কই গ্রহণ করে
- তীব্র তাপ বা ব্যথায় পেশি কোনো স্নায়ুকেন্দ্রের সমন্বয় ছাড়াই নিজে সরাসরি সংকুচিত হতে পারে
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- চিকিৎসাবিজ্ঞানে চিকিৎসকেরা রিফ্লেক্স হ্যামার (reflex hammer) দিয়ে রোগীর হাঁটুর নিচে হালকা আঘাত করে হাঁটুর ঝাঁকুনি প্রতিবর্ত ক্রিয়া (knee-jerk reflex) পরীক্ষা করেন। এর মাধ্যমে সুষুম্নাকাণ্ড ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র অক্ষত আছে কি না তা নির্ণয় করা যায়, যা স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
- রান্নাঘরে চুলায় হাত পুড়ে যাওয়ার দুর্ঘটনা থেকে তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষা বুঝতে এবং নবজাতক শিশুর স্নায়বিক সক্রিয়তা (Babinski reflex) যাচাই করতে প্রতিবর্ত ক্রিয়ার জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।