মৌলিক পদার্থ বা মৌল হলো এমন বিশুদ্ধ পদার্থ, যাকে রাসায়নিকভাবে বিশ্লেষণ করে অন্য কোনো মৌল পাওয়া যায় না। যৌগিক পদার্থ বা যৌগ হলো এমন পদার্থ, যাকে রাসায়নিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দুই বা ততোধিক ভিন্ন মৌল পাওয়া যায়।
পরমাণু হলো মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা, যার মধ্যে ওই মৌলের বৈশিষ্ট্য থাকে। নাইট্রোজেন পরমাণু নাইট্রোজেনের এবং অক্সিজেন পরমাণু অক্সিজেনের পরিচয় বহন করে।
ইংরেজি নামের প্রথম অক্ষর থেকে প্রতীক · লাতিন নাম থেকে প্রতীক
পড়ে নাও
কোনো মৌলের ইংরেজি বা ল্যাটিন নামের সংক্ষিপ্ত রূপকে ওই মৌলের প্রতীক বলে। প্রত্যেক মৌলের নিজস্ব প্রতীক আছে। প্রতীক ব্যবহারে পুরো নাম বারবার না লিখেও মৌলকে নির্দিষ্টভাবে চেনানো যায়।
একটি অণুতে কোন কোন মৌলের কতটি করে পরমাণু আছে, তা প্রকাশ করে অণুর সংকেত। সংকেত লেখার জন্য মৌলের প্রতীক এবং প্রয়োজনমতো প্রতীকের নিচে ডান পাশে ছোট সংখ্যা ব্যবহার করা হয়।
আমাদের চারপাশের পানি, বাতাস, গাছপালা ও লোহার জিনিস কী দিয়ে তৈরি—এই প্রশ্ন থেকেই পরমাণু সম্পর্কে ধারণার শুরু। চোখে একটি বস্তু একটানা মনে হলেও তার ভেতরে অতি ক্ষুদ্র কণা রয়েছে।
একটি সবুজ পাতাকে বারবার ছোট করে কাটার কাজ থেকে পদার্থের ক্ষুদ্র কণা সম্পর্কে ভাবা যায়। উঠানের আমগাছের একটি পাতা নিলে প্রথমে সেটিকে সহজেই দেখা ও ধরা যায়।
পরমাণু অত্যন্ত ছোট হলেও তার ভেতরে গঠন রয়েছে। পরমাণুর গঠন আলোচনায় ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনকে মৌলিক কণিকা বলা হয়। এগুলোই পরমাণুর তিন ধরনের স্থায়ী কণিকা হিসেবে পরিচিত।
কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত প্রোটনের সংখ্যাকে পারমাণবিক সংখ্যা বলে। এর প্রতীক Z। এটি মৌলের স্থায়ী পরিচয়: হাইড্রোজেনের প্রোটন একটি, অক্সিজেনের আটটি। নিরপেক্ষ পরমাণুতে ইলেকট্রনের সংখ্যাও প্রোটনের সংখ্যার সমান হয়।
কোনো অণুর ভর কার্বন-12 পরমাণুর ভরের বারো ভাগের এক ভাগের তুলনায় কত গুণ, তাকে আপেক্ষিক আণবিক ভর বলে। একটি অণুতে থাকা সব পরমাণুর আপেক্ষিক পারমাণবিক ভর যোগ করে এই মান পাওয়া যায়।
পরমাণুর ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন গুনতে প্রথমে তার পারমাণবিক সংখ্যা এবং ভরসংখ্যা শনাক্ত করতে হয়। পারমাণবিক সংখ্যা হলো নিউক্লিয়াসের প্রোটন সংখ্যা। ভরসংখ্যা হলো নিউক্লিয়াসের প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যা।
একই মৌলের যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা এবং ভরসংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোটোপ বলে। প্রোটন সংখ্যা একই থাকায় মৌলের পরিচয় বদলায় না।
নিউক্লিয়াসের প্রোটন সংখ্যাই পারমাণবিক সংখ্যা, আর প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যা হলো ভরসংখ্যা। তাই মোট সংখ্যা থেকে প্রোটন বাদ দিলে নিউট্রন থাকে। সূত্র N=A-Z।
তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ হলো এমন আইসোটোপ, যার নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিবর্তিত হয়ে তেজস্ক্রিয় রশ্মি নিঃসরণ করে। আলফা, বিটা ও গামা রশ্মি জীবন্ত কোষের ক্ষতি করতে পারে।
তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ চিকিৎসা, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগে, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বা দুর্ঘটনা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বলতে তেজস্ক্রিয় উৎস থেকে নির্গত আলফা, বিটা ও গামার মতো বিকিরণ বোঝায়।
পরমাণুর মডেল হলো পরমাণুর ভেতরের গঠন ও ইলেকট্রনের আচরণ বোঝানোর একটি ধারণাগত বর্ণনা। পরমাণুর কোন অংশে ভর কেন্দ্রীভূত, ইলেকট্রন কোথায় থাকে এবং শক্তি গ্রহণ বা ত্যাগ করলে কী ঘটে—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে মডেল ব্যবহার করা হয়।
রাদারফোর্ড পরমাণু মডেল ও এর সীমাবদ্ধতা · বোর পরমাণু মডেল ও এর সীমাবদ্ধতা
পড়ে নাও
১৯১১ সালে প্রস্তাবিত রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল অনুযায়ী পরমাণুর কেন্দ্রে ক্ষুদ্র, ঘন, ধনাত্মক নিউক্লিয়াস থাকে এবং ইলেকট্রন তাকে ঘিরে ঘোরে। বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড ১৯১১ সালে পরমাণুর কেন্দ্র হিসেবে এই নিউক্লিয়াসের ধারণা দেন।
পরমাণুর বিভিন্ন শক্তিস্তরে ইলেকট্রন কীভাবে বণ্টিত থাকে, তাকে ইলেকট্রন বিন্যাস বলে। বোরের মডেলে নিউক্লিয়াসের চারদিকে অনুমোদিত কক্ষপথগুলো হলো প্রধান শক্তিস্তর বা শেল।
পরমাণুর শক্তিস্তর ও উপস্তর · শক্তিস্তরে ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা · ইলেকট্রন বিন্যাস
পড়ে নাও
2n² সূত্র একটি প্রধান শক্তিস্তরের সর্বোচ্চ ইলেকট্রন ধারণক্ষমতা জানায়: Nₘₐₓ=2n²। এখানে Nₘₐₓ সর্বোচ্চ ইলেকট্রন সংখ্যা এবং n প্রধান শক্তিস্তরের ক্রম; দুটিই এককবিহীন, কোনো SI একক নেই। K-এর জন্য n=1, তাই 2×1²=2টি।
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প সংলগ্ন একটি বিদ্যালয়ের রসায়ন গবেষণাগারে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসহ পর্যায় সারণির কয়েকটি মৌলের পারমাণবিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করছে। শিক্ষক তাদের অনুশীলনের জন্য তিনটি মৌল P, Q ও R উপস্থাপন করলেন (প্রতীকগুলো সংশ্লিষ্ট মৌলের প্রচলিত প্রতীক নয়):
১. মৌল P: এর পারমাণবিক সংখ্যা ১১ এবং ভর সংখ্যা ২৩; মাটি ও লবণাক্ত পানিতে এর আয়ন প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান।
২. মৌল Q: এর পারমাণবিক সংখ্যা ২০।
৩. মৌল R: রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় মৌলটির একটি আইসোটোপ হলো ²³⁵₉₂R, যার নিউক্লিয়াসে নিয়ন্ত্রিত বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর বিদ্যুৎ শক্তি উৎপন্ন করা হয়।
ক
আইসোটোপ (isotope) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
যে সকল পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যা সমান কিন্তু ভর সংখ্যা ভিন্ন, তাদেরকে পরস্পরের আইসোটোপ বলে।
খ
একটি নিরপেক্ষ পরমাণুর সামগ্রিক চার্জ শূন্য হয় কেন — ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
পরমাণুর নিউক্লিয়াসে নির্দিষ্ট সংখ্যক ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন থাকে এবং নিউক্লিয়াসের বাইরে বিভিন্ন শক্তিস্তরে সমসংখ্যক ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন আবর্তন করে। প্রতিটি প্রোটনের প্রকৃত চার্জ (+১.৬০ × ১০⁻¹⁹ C) এবং প্রতিটি ইলেকট্রনের প্রকৃত চার্জ (−১.৬০ × ১০⁻¹⁹ C) পরিমাণে সমান কিন্তু বিপরীতধর্মী হওয়ায় তারা পরস্পরকে সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত করে; আর নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রন চার্জহীন। ফলে স্বাভাবিক অবস্থায় পরমাণুতে কোনো নিট চার্জ থাকে না এবং পরমাণু সামগ্রিকভাবে চার্জ নিরপেক্ষ হয়।
গ
উদ্দীপকের P মৌলটি ১টি ইলেকট্রন ত্যাগ করে একক ধনাত্মক আয়নে (P⁺) পরিণত হলে আয়নটির প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন সংখ্যা নির্ণয় করে এর ইলেকট্রন বিন্যাস দেখাও।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপক অনুসারে, মৌল P-এর পারমাণবিক সংখ্যা Z = ১১ এবং ভর সংখ্যা A = ২৩। মৌলটি হলো সোডিয়াম (Na)।
১. প্রোটন সংখ্যা: পারমাণবিক সংখ্যা Z = ১১ হওয়ায় প্রোটন সংখ্যা = ১১।
২. নিউট্রন সংখ্যা: নিউট্রন সংখ্যা n = ভর সংখ্যা (A) − পারমাণবিক সংখ্যা (Z) = ২৩ − ১১ = ১২।
৩. ইলেকট্রন সংখ্যা: নিরপেক্ষ পরমাণুতে ১১টি ইলেকট্রন থাকে। মৌলটি ১টি ইলেকট্রন ত্যাগ করে P⁺ ক্যাটায়নে পরিণত হওয়ায় এতে অবশিষ্ট ইলেকট্রন সংখ্যা = ১১ − ১ = ১০।
৪. P⁺ আয়নের ইলেকট্রন বিন্যাস: ১০টি ইলেকট্রন শক্তিস্তরে এভাবে বিন্যস্ত থাকে: K = ২, L = ৮।
ফলে P⁺ আয়নটি নিয়ন (Ne) গ্যাসের মতো অত্যন্ত স্থিতিশীল অষ্টকপূর্ণ ইলেকট্রন কাঠামো লাভ করে।
ঘ
উদ্দীপকের Q মৌলটির ইলেকট্রন বিন্যাস নির্ণয় করো। 2n² সূত্র অনুযায়ী M শক্তিস্তরে ১৮টি ইলেকট্রন থাকার ক্ষমতা সত্ত্বেও Q-এর M স্তরে কেন ৮টি ইলেকট্রন থাকে — অষ্টক নিয়মের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের Q মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা Z = ২০, অর্থাৎ নিরপেক্ষ পরমাণুতে ২০টি ইলেকট্রন আছে (মৌলটি ক্যালসিয়াম, Ca)।
১. 2n² সূত্র অনুযায়ী ধারণক্ষমতা: K স্তরে ২ × ১² = ২, L স্তরে ২ × ২² = ৮, M স্তরে ২ × ৩² = ১৮।
২. শুধু 2n² সূত্র অনুসরণ করলে ২০টি ইলেকট্রনের বিন্যাস হতো K = ২, L = ৮, M = ১০।
৩. অষ্টক নিয়মের প্রয়োগ: কিন্তু কোনো পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে ৮টির বেশি ইলেকট্রন থাকতে পারে না; ৮টি ইলেকট্রন থাকলেই পরমাণু স্থিতিশীল হয়। M স্তরে ১০টি ইলেকট্রন থাকলে M স্তর সর্ববহিঃস্থ স্তর হয়ে ৮-এর বেশি ইলেকট্রন ধারণ করত, যা সম্ভব নয়। তাই M স্তরে ৮টি ইলেকট্রন রেখে অবশিষ্ট ২০ − (২ + ৮ + ৮) = ২টি ইলেকট্রন N স্তরে যায়।
৪. সিদ্ধান্ত: Q-এর ইলেকট্রন বিন্যাস K = ২, L = ৮, M = ৮, N = ২। M স্তরের ধারণক্ষমতা ১৮ হলেও অষ্টক নিয়মের কারণে (সর্ববহিঃস্থ স্তরে সর্বোচ্চ ৮টি) পরবর্তী ইলেকট্রন N স্তরে প্রবেশ করে।