পরমাণুর গঠন ও আইসোটোপ
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
পেন্সিলের গ্রাফাইট বা কাঠকয়লার মূল উপাদান হলো কার্বন (C)। একটি সাধারণ কার্বন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ৬টি প্রোটন ও ৬টি নিউট্রন থাকে এবং বাইরে বিভিন্ন শক্তিস্তরে ৬টি ইলেকট্রন ঘোরে, যার ফলে এর ভর সংখ্যা ১২। যদি কোনো বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অতিরিক্ত ১টি নিউট্রন যোগ করে নিউট্রন সংখ্যা ৭ করা হয়, তবে পরমাণুটির কী ঘটবে — মৌলটি কি বদলে যাবে, নাকি কার্বনই থাকবে এবং এর ভর সংখ্যা কত হবে?
১টি নিউট্রন যোগ করার পর পরমাণুটির পরিচয় ও ভর সংখ্যা কী হবে?
- মৌলটি কার্বনই থাকবে — প্রোটন সংখ্যা ৬ অপরিবর্তিত থাকে, কেবল ভর সংখ্যা বেড়ে ১৩ হয়ে কার্বনের আইসোটোপ হবে
- মৌলটি পরিবর্তিত হয়ে নাইট্রোজেন হবে — নিউক্লিয়াসে মোট কণা বা ভর সংখ্যা বাড়লে মৌল বদলে যায়
- মৌলটি বদলে একটি ধনাত্মক আয়নে পরিণত হবে — নিউট্রন যোগ করায় পরমাণুর মোট চার্জ বৃদ্ধি পাবে
যা বদলাতে পারবে
- প্রোটন সংখ্যা (p): ১ থেকে ৩৬
- নিউট্রন সংখ্যা (n): ০ থেকে ৫০
- ইলেকট্রন সংখ্যা (e): ০ থেকে ৩৬
যা মেপে দেখাবে
- মৌলের প্রতীক
- পারমাণবিক সংখ্যা (Z)
- ভর সংখ্যা (A)
- মোট চার্জ
চালানোর সময় খেয়াল করো
- নিউট্রন স্লাইডারটি ৬ থেকে বাড়িয়ে ৭ করো। মৌলের প্রতীক (C) বা পারমাণবিক সংখ্যা (Z) কি বদলেছে, নাকি কেবল ভর সংখ্যা (A) ১২ থেকে বেড়ে ১৩ হয়েছে?
নিজে করে দেখো
- খাবার লবণের ক্লোরাইড আয়ন Cl⁻ তৈরি করো, যার ভর সংখ্যা ৩৫।
ইঙ্গিত
প্রোটন সংখ্যা মৌল ঠিক করে; আধান = প্রোটন − ইলেকট্রন; ভর সংখ্যা = প্রোটন + নিউট্রন।
- পুরনো হাড়ের বয়স নির্ণয়ে ব্যবহৃত কার্বন-১৪ পরমাণু তৈরি করো (নিরপেক্ষ পরমাণু)।
ইঙ্গিত
কার্বনের প্রোটন ৬-ই থাকবে; বাড়তি ভর আসবে নিউট্রন থেকে।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
মৌলের পরিচয় ও আইসোটোপ
একটি পরমাণুর পরিচয় সম্পূর্ণভাবে তার প্রোটন সংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যার (Z) ওপর নির্ভর করে। কার্বন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ৬টি প্রোটন থাকে, তাই প্রোটন সংখ্যা ৬ থাকা পর্যন্ত পরমাণুটি সবসময় কার্বনই (C) থাকে। নিউক্লিয়াসে ১টি নিউট্রন যোগ করলে কেবল এর ভর সংখ্যা A = p + n = ৬ + ৭ = ১৩ হয়। একই মৌলের পরমাণু যাদের প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন হওয়ায় ভর সংখ্যা ভিন্ন হয়, তাদেরকে পরস্পরের আইসোটোপ বলে। এখানে তৈরি হওয়া পরমাণুটি হলো কার্বনের আইসোটোপ কার্বন-১৩ (¹³C)। নিউট্রন চার্জহীন বা নিরপেক্ষ কণা হওয়ায় পরমাণুর চার্জের কোনো পরিবর্তন হয় না, এটি চার্জমুক্ত বা নিরপেক্ষই থাকে।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করে নিউক্লিয়াসে যেকোনো কণা যোগ হলেই মৌল বদলে যায় অথবা ভর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পরমাণুটি পরবর্তী মৌলে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু পর্যায় সারণিতে মৌলের স্থান ও ধর্ম ঠিক হয় শুধুমাত্র প্রোটন সংখ্যা দ্বারা; প্রোটন সংখ্যা ৬ থেকে ৭ হলেই কেবল তা নাইট্রোজেনে পরিবর্তিত হতো। অন্যদিকে নিউট্রন কোনো আধান বহন করে না (চার্জ শূন্য)। তাই নিউট্রন যোগ বা বিয়োগ করলে পরমাণুর মোট চার্জ বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় না এবং এটি আয়নে পরিণত হয় না।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- ভর সংখ্যা বা নিউক্লিয়াসের মোট কণা বৃদ্ধি পেলে মৌলের পরিচয় বদলে যায়
- নিউক্লিয়াসে নিউট্রন যোগ করলে পরমাণুর চার্জ বৃদ্ধি পায়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্যান্সার নিরাময় ও থাইরয়েড রোগ নির্ণয় — বাংলাদেশে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রে কোবাল্ট-৬০ (⁶⁰Co) আইসোটোপ থেকে নির্গত ক্ষতিকর গামা রশ্মি ব্যবহার করে টিউমার ও ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয় এবং আয়োডিন-১৩১ (¹³¹I) আইসোটোপের সাহায্যে থাইরয়েড গ্রন্থির চিকিৎসা করা হয়।
- কৃষিক্ষেত্রে উন্নত ফসলের জাত উদ্ভাবন ও কার্বন ডেটিং — বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) আইসোটোপের বিকিরণ ব্যবহার করে রোগ ও প্রতিকূলতা সহনশীল ধানের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে; অন্যদিকে কার্বন-১৪ (¹⁴C) আইসোটোপের ক্ষয়কাল পরীক্ষা করে বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড় বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বয়স নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা হয়।