আমাদের দেহকোষে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া চলে, যাকে বিপাক বলে। এসব বিক্রিয়ার কিছু উৎপাদ দেহের কাজে লাগে, কিন্তু কিছু উৎপাদ বিষাক্ত। এগুলো দেহে দীর্ঘদিন জমে থাকলে নানা রোগ, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
বিপাকের ফলে তৈরি যেসব অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর পদার্থ দেহ থেকে বের করে দিতে হয়, সেগুলোই রেচন পদার্থ। মানুষের রেচন পদার্থের বেশির ভাগ নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য, আর এগুলো প্রধানত মূত্র হিসেবে দেহ থেকে বের হয়।
ইউরিয়া মানুষের প্রধান নাইট্রোজেনঘটিত রেচন পদার্থ এবং মূত্রের একটি প্রধান উপাদান। আমরা যে প্রোটিন খাই, তা পরিপাক হয়ে অ্যামাইনো এসিড হিসেবে দেহে শোষিত হয়।
আমরা খাবারের সাথে নানা ধরনের খনিজ লবণ গ্রহণ করি, যেমন সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার লবণ) ও পটাশিয়াম ক্লোরাইড। দেহের কাজের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ দরকার; প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ রেচন পদার্থ হিসেবে দেহ থেকে বের করে দিতে হয়।
দেহের রেচন পদার্থের বেশির ভাগই নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য, অর্থাৎ যে বর্জ্যের অণুতে নাইট্রোজেন থাকে। এগুলো দেহের কোনো কাজে লাগে না, বরং জমে থাকলে রোগ সৃষ্টি করে। ইউরিয়া: প্রধান নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য; যকৃতে তৈরি হয়।
কার্বন ডাই-অক্সাইড একটি রেচন পদার্থ, কারণ এটি দেহকোষের বিপাকে তৈরি হয় এবং দেহের কোনো কাজে লাগে না। তবে এটি নাইট্রোজেনঘটিত নয়, আর একে বৃক্ক নয়, ফুসফুস বের করে। প্রতিটি দেহকোষে শ্বসন চলে।
বৃক্ক হলো মানুষের প্রধান রেচন অঙ্গ, যা রক্ত থেকে নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি-লবণ অপসারণ করে মূত্র তৈরি করে। দেহের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষের দুটি বৃক্ক থাকে।
বৃক্কের লম্বচ্ছেদে বাইরের আবরণ, ভেতরের দুটি অঞ্চল এবং মূত্র সংগ্রহের স্থান দেখা যায়। প্রতিটি অংশের অবস্থানের সঙ্গে তার কাজ মিলিয়ে বুঝলে চিত্রের চিহ্নগুলো মনে রাখা সহজ হয়।
বৃক্কের ভেতরে অসংখ্য সূক্ষ্ম নালিকা থাকে, যাদের ইউরিনিফেরাস নালিকা বলে। প্রতিটি ইউরিনিফেরাস নালিকার দুটি প্রধান অংশ: নেফ্রন ও সংগ্রাহী নালিকা। ইউরিনিফেরাস নালিকার ক্ষরণকারী অংশকে নেফ্রন বলে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে অভিস্রবণ শেখা হয়েছে। একটি বৈষম্যভেদ্য পর্দার এক পাশে দ্রবণ এবং অন্য পাশে বিশুদ্ধ দ্রাবক (এখানে পানি) রাখলে বিশুদ্ধ দ্রাবকের দিক থেকে দ্রবণের দিকে অভিস্রবণ ঘটে।
কিছু রোগের কারণে বৃক্কের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হতে পারে। তখন বৃক্কে জ্বালাপোড়া, প্রস্রাবে সমস্যা ও বৃক্কে পাথর দেখা দিতে পারে। সারা শরীর ফুলে যাওয়া (পানি জমা)। প্রস্রাবের সাথে অ্যালবুমিন বের হওয়া। প্রস্রাবে রক্তের ছোপ।
তাৎক্ষণিক বৃক্ক বিকল হলো হঠাৎ বৃক্কের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হওয়া, যার ফলে রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি যথাযথভাবে অপসারিত হয় না। এতে মূত্র তৈরি ও দেহের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা দেখা দেয়।
বৃক্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা অকেজো হলে রক্ত থেকে বর্জ্য সরানো বন্ধ হয়ে যায়। তখন যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে রক্ত ছেঁকে পরিশোধন করা হয়, তাকে ডায়ালাইসিস বলে।
বৃক্ক ক্ষতিগ্রস্ত বা অকেজো হলে সুস্থ মানুষের একটি সুস্থ বৃক্ক দিয়ে তা বদলে দেওয়া যায়; একে বৃক্ক প্রতিস্থাপন বলে। বৃক্ক দুইভাবে পাওয়া যায়: নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে: রোগীর বাবা, মা, ভাইবোন, চাচা, মামা, খালা, ফুফু।
মূত্রনালী বা মূত্রতন্ত্র হলো মূত্র তৈরি, বহন, জমা রাখা ও দেহ থেকে বের করার অঙ্গগুলোর (বৃক্ক, ইউরেটার, মূত্রথলি ও ইউরেথ্রা) সমন্বয়ে গঠিত পথ। এতে বৃক্ক, ইউরেটার, মূত্রথলি ও ইউরেথ্রা থাকে।
রংপুরের ৬০ বছর বয়সী কৃষক রহিম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁর প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া, শরীর ও মুখে পানি জমে ফুলে যাওয়া (ইডিমা) এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান তাঁর উভয় বৃক্ক প্রায় বিকল হয়ে গেছে। বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাঁকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হবে অথবা একটি সুস্থ বৃক্ক প্রতিস্থাপন (kidney transplant) করতে হবে। তবে উপযুক্ত জীবিত আত্মীয় দাতা না পাওয়ায় চিকিৎসকেরা মরণোত্তর বৃক্ক দানের (cadaveric organ donation) মাধ্যমে অঙ্গ সংগ্রহের বিকল্প সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
ক
বৃক্কের গঠন ও কাজের একককে কী বলে?
উত্তর দেখাও
বৃক্কের গঠন ও কাজের একককে নেফ্রন (Nephron) বলে।
খ
একটি বৃক্ক অকেজো হলেও মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে কেন—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
মানুষের দুটি বৃক্কে মোট প্রায় ২০ থেকে ২৪ লক্ষ নেফ্রন থাকে, যা স্বাভাবিক শারীরিক চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি কার্যক্ষমতা প্রদান করে। ফলে একটি বৃক্ক নষ্ট বা অপসারিত হলেও অবশিষ্ট সুস্থ বৃক্কটি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে একাই দেহের রক্ত থেকে প্রয়োজনীয় বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণ ও অসমোরেগুলেশন সুষ্ঠুভাবে বজায় রাখতে পারে, যার কারণে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।
গ
রহিম মিয়ার রক্ত পরিশোধনে কৃত্রিম বৃক্ক বা ডায়ালাইজার কীভাবে কাজ করে—তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকে রহিম মিয়ার রক্ত পরিশোধনে হিমোডায়ালাইসিস ডায়ালাইজার মেশিন ব্যবহার করা হয়, যা নিম্নরূপে কাজ করে:
১. রক্ত পরিবহন ও হেপারিন প্রয়োগ: রোগীর কবজির ধমনি থেকে রক্ত বিশেষ নলের মাধ্যমে ডায়ালাইজারে নেওয়া হয়। রক্তনালির বাইরে যেন রক্ত জমাট না বাঁধে, সেজন্য রক্তে হেপারিন মেশানো হয়।
২. সেলোফেন পর্দা ও ব্যাপন: ডায়ালাইজারের ভেতরে রক্ত আংশিক ভেদ্য সেলোফেন নালির মধ্য দিয়ে যায়, যার বাইরে বিপরীতমুখী প্রবাহে তাজা ডায়ালাইসিস দ্রবণ প্রবাহিত হয়। ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে রক্ত থেকে অতিরিক্ত ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন ও লবণ ব্যাপন প্রক্রিয়ায় সেলোফেন ঝিল্লি ভেদ করে ডায়ালাইসিস দ্রবণে চলে যায়।
৩. পরিশোধিত রক্ত ফেরত: রক্তের প্রয়োজনীয় রক্তকণিকা ও প্রোটিন সেলোফেন নালির ভেতরে অক্ষত থাকে। পরিশেষে পরিশোধিত রক্ত বুদ্বুদমুক্ত করে শিরার মাধ্যমে রোগীর দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘ
'রহিম মিয়ার মতো রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সুস্থতার জন্য ডায়ালাইসিসের চেয়ে মরণোত্তর বৃক্ক দান ও সফল প্রতিস্থাপন অধিক ফলপ্রসূ'—যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উক্তিটি অত্যন্ত যথার্থ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে সুস্পষ্ট। বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
১. ডায়ালাইসিসের সীমাবদ্ধতা: ডায়ালাইসিস বৃক্ক বিকলের একটি সাময়িক কৃত্রিম বিকল্প মাত্র। এতে রোগীকে প্রতি সপ্তাহে ২–৩ বার হাসপাতালে এসে ৪–৫ ঘণ্টা সময় দিতে হয়, যা রোগীর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ডায়ালাইসিসে রক্তশূন্যতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে এবং এটি বৃক্কের হরমোনজনিত কাজ সম্পাদন করতে পারে না।
২. বৃক্ক প্রতিস্থাপনের শ্রেষ্ঠত্ব: সফল প্রতিস্থাপনের পর সংযোজিত সুস্থ বৃক্কটি স্বাভাবিক জৈবিক অঙ্গ হিসেবে ২৪ ঘণ্টা অবিরাম রক্ত পরিশোধন ও অসমোরেগুলেশন নিশ্চিত করে। এর ফলে রোগীর জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরে যেতে পারেন।
৩. মরণোত্তর বৃক্ক দানের অপরিহার্যতা: বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বৃক্ক বিকল হয়ে মারা যান, অথচ জীবিত আত্মীয় উপযুক্ত দাতার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ব্রেন ডেথ (Brain Death) ঘোষিত কোনো ব্যক্তির মরণোত্তর বৃক্ক দানের মাধ্যমে দুটি কিডনি দিয়ে দুজন মুমূর্ষু রোগীকে নতুন জীবন দান করা সম্ভব। সামাজিক ও ধর্মীয় সচেতনতা সৃষ্টি করে মরণোত্তর বৃক্ক দান উৎসাহিত করলে অঙ্গের ঘাটতি দূর হবে।
৪. উপসংহার: রোগী সারা জীবন কৃত্রিম ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল থাকার চেয়ে সফল বৃক্ক প্রতিস্থাপনে স্বাভাবিক দীর্ঘায়ু লাভ করেন। তাই দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধানের জন্য মরণোত্তর বৃক্ক দান ও সফল প্রতিস্থাপনই অধিক ফলপ্রসূ।