প্রতিটি নেফ্রন একটি ক্ষুদ্র ছাঁকনি-কারখানা। এর প্রতিটি অংশের গঠন তার কাজের সাথে মিলিয়ে বুঝতে হয়।
গঠন
রেনাল করপাসল বা মালপিজিয়ান অঙ্গ: দুটি অংশে বিভক্ত।
বোমান্স ক্যাপসুল: দুই স্তরবিশিষ্ট পেয়ালার মতো প্রসারিত অংশ, যা গ্লোমেরুলাসকে বেষ্টন করে রাখে।
গ্লোমেরুলাস: রেনাল ধমনী থেকে আসা অন্তর্মুখী ধমনিকা (afferent arteriole) প্রায় 50টি কৈশিক জালিকায় ভাগ হয়ে এই গুচ্ছ তৈরি করে। কৈশিক জালিকাগুলো আবার মিলে বহির্মুখী ধমনিকা (efferent arteriole) হয়ে বোমান্স ক্যাপসুল থেকে বের হয়।
রেনাল টিউবুল: বোমান্স ক্যাপসুলের পেছনের প্যাঁচানো নালিকা; তিন অংশ: নিকটবর্তী প্যাঁচানো নালিকা (Proximal convoluted tubule), হেনলির লুপ (Loop of Henle) ও প্রান্তীয় প্যাঁচানো নালিকা (Distal convoluted tubule)।
রেনাল টিউবুল শেষে সংগ্রাহী নালিকায় যুক্ত হয়।
কাজ: মূত্র তৈরির ধাপ
ছাঁকা: গ্লোমেরুলাস ছাঁকনির মতো কাজ করে। রক্ত থেকে ইউরিয়া, পানি, গ্লুকোজ ও খনিজ লবণ ছেঁকে বোমান্স ক্যাপসুলে আসে; এই তরলকে আলট্রাফিল্ট্রেট বলে।
শোষণ ও ক্ষরণ: আলট্রাফিল্ট্রেট রেনাল টিউবুল দিয়ে যাওয়ার সময় বারবার শোষণ ও ক্ষরণের মধ্য দিয়ে যায়। গ্লুকোজ ও প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ রক্তে ফিরে যায়, আর প্রয়োজনমতো পানিও রক্তে ফেরত যায়।
মূত্র: শেষে যে তরল থাকে, সেটিই মূত্র। তা সংগ্রাহী নালিকা দিয়ে পেলভিসে, তারপর ইউরেটার হয়ে মূত্রথলিতে যায়।
ইউরিয়ামুক্ত পরিশোধিত রক্ত শিরা দিয়ে ফিরে যায়।
উদাহরণ: একজন সুস্থ মানুষের রক্তে গ্লুকোজ আছে, গ্লোমেরুলাসে তা ছেঁকেও যায়, তবু তার মূত্রে গ্লুকোজ পাওয়া যায় না কেন?
ধাপ
গ্লুকোজের কী হয়
ইউরিয়ার কী হয়
গ্লোমেরুলাসে ছাঁকা
আলট্রাফিল্ট্রেটে আসে
আলট্রাফিল্ট্রেটে আসে
রেনাল টিউবুলে
রক্তে ফিরে যায়
নালিকায় থেকে যায়
মূত্রে
থাকে না
থাকে
কারণ রেনাল টিউবুল প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ রক্তে ফিরিয়ে নেয়।
সাধারণ ভুল হলো ভাবা যে গ্লোমেরুলাস শুধু বর্জ্য ছাঁকে। গ্লোমেরুলাস দরকারি ও অদরকারি সব ছোট পদার্থ ছেঁকে নেয়; দরকারিগুলো বাছাই করে ফেরত আনে রেনাল টিউবুল।
মনে রাখো: নেফ্রনের গ্লোমেরুলাস রক্ত ছেঁকে আলট্রাফিল্ট্রেট তৈরি করে, রেনাল টিউবুল তা থেকে গ্লুকোজ, প্রয়োজনীয় লবণ ও পানি রক্তে ফিরিয়ে নেয়, আর অবশিষ্ট তরল মূত্র হয়ে সংগ্রাহী নালিকায় যায়।
একজন সুস্থ মানুষের দুটি বৃক্কে প্রতিদিন প্রায় ১২০০ L রক্ত প্রবাহিত হয় এবং গ্লোমেরুলাসে তার ১৫% অর্থাৎ ১৮০ L তরল পরিশ্রুত হয়ে বোম্যান্স ক্যাপসুলে প্রবেশ করে। যদি এই পরিশ্রুত তরলের (ফিলট্রেট) ৯৯% পানি ও দরকারি উপাদান রেনাল নালিকায় পুনরায় রক্তে শোষিত (reabsorption) হয়, তবে প্রতিদিন প্রায় কত লিটার মূত্র তৈরি হবে?
অনুশীলনের প্রশ্ন
১
নেফ্রনের রেনাল করপাসলে বোম্যান্স ক্যাপসুলের ভেতরে অ্যাফারেন্ট ধমনিকা (afferent arteriole) প্রায় ৫০টি কৈশিকজালিকায় বিভক্ত হয়ে গ্লোমেরুলাস গঠন করে এবং এগুলো পুনরায় একত্রিত হয়ে ইফারেন্ট ধমনিকা (efferent arteriole) হিসেবে বের হয়ে যায়। গ্লোমেরুলার কৈশিকজালিকায় উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণ কোনটি?
ক
ইফারেন্ট ধমনিকার ব্যাস অ্যাফারেন্ট ধমনিকার চেয়ে সরু হওয়া
খ
অ্যাফারেন্ট ধমনিকার ব্যাস ইফারেন্ট ধমনিকার চেয়ে সরু হওয়া
গ
বোম্যান্স ক্যাপসুলের প্রাচীর অধিক পুরু ও অনমনীয় হওয়া
ঘ
রেনাল শিরার রক্তচাপ রেনাল ধমনির চেয়ে বেশি থাকা
উত্তর ও ব্যাখ্যা
সঠিক উত্তর:
ক) ইফারেন্ট ধমনিকার ব্যাস অ্যাফারেন্ট ধমনিকার চেয়ে সরু হওয়া
রেনাল ধমনি থেকে সৃষ্ট অ্যাফারেন্ট ধমনিকা বোম্যান্স ক্যাপসুলে প্রবেশ করে প্রায় ৫০টি কৈশিকজালিকায় বিভক্ত হয়ে গ্লোমেরুলাস গঠন করে এবং পুনরায় মিলিত হয়ে ইফারেন্ট ধমনিকা হিসেবে বাইরে আসে।
প্রবেশকারী অ্যাফারেন্ট ধমনিকার ব্যাস নির্গমনকারী ইফারেন্ট ধমনিকার ব্যাসের চেয়ে বেশি। নির্গমনের পথ সরু হওয়ায় গ্লোমেরুলার কৈশিকজালিকায় প্রচণ্ড উদস্থিতিক চাপ সৃষ্টি হয়, যা রক্তরস থেকে পানি ও ক্ষুদ্র দ্রবণীয় অণুকে বোম্যান্স ক্যাপসুলের গহ্বরে পরিশ্রুত (ultrafiltration) হতে বাধ্য করে।
২
ময়মনসিংহের একটি কৃষি খামারে কর্মরত একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বৃক্কীয় কার্যক্রম পরীক্ষা করা হলো। এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তক অনুসারে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দুটি বৃক্কের গ্লোমেরুলাসে প্রতিদিন প্রায় ১৮০ L তরল পরিশ্রুত (glomerular filtrate) হয়। এই পরিশ্রুত তরলের শতকরা প্রায় ৯৯ ভাগই রেনাল নালিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় রক্তে পুনঃশোষিত (reabsorption) হয়ে দেহে ফিরে আসে। অবশিষ্ট শতকরা ১ ভাগ তরল মূত্র হিসেবে নিষ্কাশিত হলে, ওই ব্যক্তি একদিনে কত লিটার (L) মূত্র নির্গত করবেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা
সঠিক উত্তর:
১.৮ L
মোট পরিশ্রুত গ্লোমেরুলার ফিলট্রেটের আয়তন V = ১৮০ L এবং রেনাল নালিকায় পানির পুনঃশোষণের হার = ৯৯%।
Vfiltrate=180 L,Reabsorption=99%
মূত্র হিসেবে নির্গত তরলের শতকরা হার = ১০০% − ৯৯% = ১% = ০.০১।
Urine fraction=100%−99%=1%=0.01
একদিনে নির্গত মূত্রের আয়তন = ১৮০ L × ০.০১ = ১.৮ L।
Vurine=180 L×0.01=1.8 L
৩
গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত ঘাম হলে বা কম পানি পান করলে মূত্রের পরিমাণ কমে এবং তা গাঢ় হলুদ বর্ণ ধারণ করে কেন? পাঠ্যপুস্তকের আলোকে শারীরবৃত্তীয় কারণ সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা
সঠিক উত্তর:
অতিরিক্ত ঘাম বা কম পানি পানের কারণে রক্তে পানির ঘাটতি দেখা দিলে অভিস্রবণিক ভারসাম্য (osmoregulation) রক্ষার্থে পিটুইটারি হরমোনের প্রভাবে নেফ্রনের রেনাল নালিকায় পানির পুনঃশোষণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে অধিকাংশ পানি রক্তে ফিরে গিয়ে মূত্রের সামগ্রিক পরিমাণ কমে যায়। অন্যদিকে মূত্রের আয়তন হ্রাস পেলেও বর্জ্য ও রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ প্রায় একই থাকে, যার দরুন মূত্রে ইউরোক্রোম (Urochrome) নামক স্বাভাবিক রঞ্জকের আপেক্ষিক ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়ে মূত্র গাঢ় হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
পানিশূন্যতায় অসমোরেগুলেশন: রক্তে পানির ঘাটতি দেখা দিলে পিটুইটারি হরমোনের প্রভাবে নেফ্রনের নালিকায় পানির পুনঃশোষণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে মূত্রের সামগ্রিক আয়তন কমে যায়।
ইউরোক্রোমের ঘনত্ব বৃদ্ধি: স্বল্প আয়তনের ঘনীভূত মূত্রে স্বাভাবিক পিত্তজাত রঞ্জক ইউরোক্রোমের আপেক্ষিক ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় মূত্র গাঢ় হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
এই টপিক নিয়ে প্রশ্ন আছে?
মেন্টরকে বাংলায় বা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করো, বা খাতার ছবি দাও। সিমুলেশন চালিয়ে বুঝিয়ে দেবে।