তাপ এক ধরনের শক্তি। কোনো বস্তুর অণুগুলো কাঁপলে বা চলাচল করলে যে শক্তি পাওয়া যায়, সেটাই তাপ। কঠিন পদার্থের অণু নিজ জায়গায় কাঁপে। তাপ দিলে কাঁপুনি বাড়ে, বন্ধন আলগা হয়ে তরল হয়, আরও তাপে গ্যাস হয়।
তাপমাত্রার পরিবর্তনে পদার্থের যে ধর্ম পরিবর্তিত হয় এবং সেই পরিবর্তন সূক্ষ্মভাবে মেপে তাপমাত্রা নির্ণয় করা যায়, তাকে তাপমাত্রিক ধর্ম বলে। এই কাজে ব্যবহৃত পদার্থটি হলো তাপমাত্রিক পদার্থ।
তাপমাত্রার স্কেল হলো তাপমাত্রাকে সংখ্যায় প্রকাশের ব্যবস্থা। সেলসিয়াস, ফারেনহাইট ও কেলভিন একই তাপমাত্রাকে ভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশ করে। স্কেল তুলনা করতে স্থির বিন্দুর মধ্যবর্তী ব্যবধান কত ভাগে ভাগ করা হয়েছে, তা বুঝতে হয়।
তাপ দিলে প্রায় সব পদার্থের আয়তন একটু বেড়ে যায়। একে তাপীয় প্রসারণ বলে। কারণটা অণুর মডেলে বোঝা সহজ। কঠিনের অণুগুলো স্প্রিং দিয়ে যুক্ত আছে বলে ভাবা যায়।
তাপ দিলে কঠিন পদার্থের অণুগুলোর কম্পন বাড়ে এবং তাদের গড় দূরত্ব কিছুটা বেড়ে যায়। ফলে বস্তুর দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন বাড়ে। সব দিকে একইভাবে প্রসারিত হওয়া কঠিনের জন্য তিনটি প্রসারণ সহগ ব্যবহার করা হয়।
তরলের নির্দিষ্ট নিজস্ব আকৃতি নেই; এটি পাত্রের আকৃতি ধারণ করে। তাই কঠিনের মতো তরলের নিজস্ব দৈর্ঘ্য বা ক্ষেত্রফল প্রসারণ আলাদাভাবে বিবেচনা না করে আয়তন প্রসারণ বিবেচনা করা হয়। তরল গরম করতে গেলে তার পাত্রটিও গরম হয়।
কঠিন পদার্থের আকার ও আয়তন দুটোই আছে, তরলের আকার নেই কিন্তু আয়তন আছে। গ্যাসের আকারও নেই, নির্দিষ্ট আয়তনও নেই; সে যে পাত্রে থাকে তার পুরো আয়তন নিয়ে নেয়। একই পরিমাণ গ্যাস ভিন্ন আয়তনের পাত্রে থাকলে তার চাপ ভিন্ন হয়।
গলন হলো তাপ গ্রহণ করে কঠিন পদার্থের তরলে পরিণত হওয়া। বাষ্পীভবন হলো তাপ গ্রহণ করে তরল পদার্থের গ্যাস বা বাষ্পে পরিণত হওয়া। ঘনীভবন হলো তাপ বর্জন করে গ্যাস বা বাষ্পের তরলে পরিণত হওয়া।
নির্দিষ্ট চাপে যে তাপমাত্রায় কোনো কঠিন পদার্থ গলতে শুরু করে, তাকে তার গলনাঙ্ক বলে। একইভাবে নির্দিষ্ট চাপে যে তাপমাত্রায় কোনো তরল ফুটে বাষ্পে পরিণত হতে শুরু করে, তাকে তার স্ফুটনাঙ্ক বলে।
বরফের ওপর চাপ বাড়ালে তার গলনাঙ্ক, অর্থাৎ গলতে শুরু করার তাপমাত্রা, কমে যায়। ফলে উপযুক্ত অবস্থায় বরফের যে অংশে চাপ পড়ে, সেই অংশ আগের গলনাঙ্কের চেয়ে কম তাপমাত্রায় গলতে পারে।
তরল থেকে বাষ্পে যাওয়ার দুটি পরিচিত প্রক্রিয়া হলো স্ফুটন ও বাষ্পায়ন। দুটিতেই তরলের অণু বায়বীয় অবস্থায় যায়, কিন্তু কোথায় এবং কোন তাপমাত্রায় পরিবর্তন ঘটে, তা এক নয়।
কোনো পদার্থের তাপমাত্রা না বদলে অবস্থা পরিবর্তনের জন্য যে তাপ গ্রহণ বা বর্জন হয়, তাকে সুপ্ততাপ বলে। সুপ্ত মানে লুকানো: তাপের আদান-প্রদান হচ্ছে, কিন্তু থার্মোমিটারের পাঠ বদলাচ্ছে না।
বাষ্পায়ন হলো তরলের উপরিভাগ থেকে যেকোনো তাপমাত্রায় বাষ্পে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া। এতে তরলকে স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছাতে হয় না। বাষ্পে পরিণত হওয়ার জন্য অণুগুলোর শক্তি প্রয়োজন।
ভেজা কাপড় শুকানোর সময় কাপড়ের পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে চলে যায়। এই বাষ্পায়নের হার বলতে বোঝায় বাষ্পায়ন কত দ্রুত ঘটছে। একই পরিমাণ পানি সব অবস্থায় একই সময়ে শুকায় না।
আপেক্ষিক তাপ হলো কোনো পদার্থের 1 kg ভরের তাপমাত্রা 1 K বাড়াতে প্রয়োজনীয় তাপ। সমান ভরের বিভিন্ন পদার্থকে একই পরিমাণ উত্তপ্ত করতে সমান তাপ লাগে না। আপেক্ষিক তাপ বেশি হলে একই তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বেশি তাপ দিতে হয়।
শীতে গোসলের জন্য বালতির ঠান্ডা পানিতে গরম পানি মেশালে গরম অংশ তাপ ছেড়ে ঠান্ডা হয়, আর ঠান্ডা অংশ সেই তাপ নিয়ে গরম হয়। তাপের আদানপ্রদান চলতে থাকে যতক্ষণ পুরো পানি একই তাপমাত্রায় পৌঁছায়।
ফারেনহাইট, সেলসিয়াস এবং কেলভিন স্কেলের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে পারবে।
বস্তুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি (বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধির সাপেক্ষে) ব্যাখ্যা করতে পারবে।
পদার্থের তাপীয় প্রসারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল এবং আয়তন সম্প্রসারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
তরলের আপাত এবং প্রকৃত প্রসারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
পদার্থের অবস্থার পরিবর্তনে তাপের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারবে।
গলন, বাষ্পীভবন ও ঘনীভবন ব্যাখ্যা করতে পারবে।
গলনাংক ও স্ফুটনাংক ব্যাখ্যা করতে পারবে।
গলনাংকের উপর চাপের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারবে।
স্ফুটন ও বাষ্পায়ন ব্যাখ্যা করতে পারবে।
গলন এবং বাষ্পীভবনের সুপ্ততাপ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
বাষ্পায়ন শীতলীকরণের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে। [Explain that evaporation causes cooling]
বাষ্পায়নের উপর নিয়ামকের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারবে।
আপেক্ষিক তাপ ও তাপ ধারণ ক্ষমতা ব্যাখ্যা করতে পারবে।
তাপ পরিমাপের মূলনীতি ব্যাখ্যা করতে পারবে।
বরফের গলনাংক নির্ণয় এবং তাপমাত্রা- সময় লেখচিত্রে উপস্থাপন করতে পারবে।
পানির স্ফুটনাংক নির্ণয় এবং তাপমাত্রা- সময় লেখচিত্রে উপস্থাপন করতে পারবে।
পরীক্ষণ কাজের উপকরণ ও যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারবে।
বিভিন্ন পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন গলনাংক এবং স্ফুটনাংক কীভাবে প্রকৃতি ও জীবনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে উপলব্ধি করতে পারবে এবং পদার্থের এমন আচরণের প্রশংসা করবে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানভীর পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারে একটি তাপীয় পরীক্ষণ করছিল। সে একটি তাপনিরোধক পাত্রে -১০°C তাপমাত্রার ২৫০ g বরফ নিল এবং একটি স্থির ক্ষমতার বৈদ্যুতিক হিটার দিয়ে তাতে প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ J হারে তাপ প্রয়োগ করতে লাগল। সমস্ত বরফ গলে প্রথমে ০°C তাপমাত্রার পানিতে পরিণত হলো এবং পরবর্তীতে উত্তপ্ত হয়ে স্ফুটনাঙ্কে (১০০°C) পৌঁছাল। (বরফের আপেক্ষিক তাপ ২১০০ J/(kg·K), পানির আপেক্ষিক তাপ ৪২০০ J/(kg·K), এবং বরফ গলনের সুপ্ততাপ L_f = ৩.৩৬ × ১০⁵ J/kg)
ক
গলনের সুপ্ততাপ কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
তাপমাত্রার পরিবর্তন না ঘটিয়ে গলনাঙ্কে কোনো কঠিন পদার্থের একক ভরকে সম্পূর্ণ তরলে পরিণত করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন হয়, তাকে ঐ পদার্থের গলনের সুপ্ততাপ বলে।
খ
বরফ গলনের সময় তাপ ক্রমাগত শোষণ করা সত্ত্বেও তাপমাত্রা স্থির থাকে কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
গলনের সময় সরবরাহকৃত তাপ পদার্থের অণুগুলোর গতিশক্তি বৃদ্ধি করে না, বরং কঠিন অবস্থার অণুগুলোর মধ্যকার সুনির্দিষ্ট কেলাসীয় বন্ধন ভেঙে তরলে রূপান্তর করতে ব্যবহৃত হয়। তাপমাত্রা হলো অণুগুলোর গড় গতিশক্তির প্রতিফলন; যেহেতু অণুগুলোর গতিশক্তি বাড়ে না, তাই সম্পূর্ণ বরফ না গলা পর্যন্ত তাপমাত্রা স্থির থাকে।
গ
উদ্দীপকের -১০°C তাপমাত্রার বরফ সম্পূর্ণ গলে ০°C তাপমাত্রার পানিতে পরিণত হতে মোট কত জুল তাপ গ্রহণ করবে?
উত্তর দেখাও
এখানে বরফের ভর m = ২৫০ g = ০.২৫ kg। -১০°C থেকে ০°C-এ পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় তাপ Q₁ = m s_ice ΔT = ০.২৫ × ২১০০ × (০ − (-১০)) = ০.২৫ × ২১০০ × ১০ = ৫২৫০ J। ০°C-এর বরফকে ০°C-এর পানিতে গলাতে প্রয়োজনীয় সুপ্ততাপ Q₂ = m L_f = ০.২৫ × ৩.৩৬ × ১০⁵ = ৮৪০০০ J। সুতরাং মোট প্রয়োজনীয় তাপ Q = Q₁ + Q₂ = ৫২৫০ + ৮৪০০০ = ৮৯২৫০ J।
ঘ
০°C তাপমাত্রার বরফ সম্পূর্ণ গলতে যে সময় লাগে, সম্পূর্ণ গলিত পানিকে স্ফুটনাঙ্কে (১০০°C) পৌঁছাতে কি তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে? গাণিতিক যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
০°C তাপমাত্রার বরফ গলতে প্রয়োজনীয় সুপ্ততাপ Q₂ = ৮৪০০০ J। হিটারের ক্ষমতা P = ৫০০ J/s হওয়ায় বরফ গলতে প্রয়োজনীয় সময় t_গলন = Q₂ / P = ৮৪০০০ / ৫০০ = ১৬৮ s (বা ২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড)। অপরপক্ষে, ০°C তাপমাত্রার সম্পূর্ণ গলিত পানিকে স্ফুটনাঙ্কে (১০০°C) পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় তাপ Q₃ = m s_water ΔT = ০.২৫ × ৪২০০ × (১০০ − ০) = ১০৫০০০ J। এই পানি উত্তপ্ত হতে প্রয়োজনীয় সময় t_পানি = Q₃ / P = ১০৫০০০ / ৫০০ = ২১০ s (বা ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ড)। যেহেতু ২১০ s > ১৬৮ s, তাই সম্পূর্ণ গলিত পানিকে স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছাতে বরফ গলনের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।