রেললাইনের ফাঁক ও তাপীয় প্রসারণ
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
ঈশ্বরদীর কাছে শীতকালে ১৫ °C তাপমাত্রায় ১২ m দৈর্ঘ্যের ইস্পাতের রেললাইন বসানো হলো। বৈশাখের চড়া রোদে সেই রেললাইনের তাপমাত্রা বেড়ে ৬০ °C পর্যন্ত পৌঁছায়। লাইনের দুটি পাতের সংযোগস্থলে কতটুকু ফাঁক রাখা প্রয়োজন?
বৈশাখের রোদে রেললাইন যাতে বেঁকে না যায়, সেজন্য সংযোগস্থলে কতটুকু ফাঁক রাখা প্রয়োজন?
- ০ mm: কোনো ফাঁক লাগবে না, কঠিন ধাতু তাপে প্রায় প্রসারিতই হয় না
- প্রায় ৬ mm: তাপমাত্রা বৃদ্ধি ৪৫ K ও আদি দৈর্ঘ্য ১২ m উভয়ের ওপর প্রসারণ নির্ভর করে
- সব রেলের জন্য নির্দিষ্ট ০.৫ mm: ফাঁক শুধু তাপমাত্রার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে, রেলের দৈর্ঘ্যের ওপর নয়
যা বদলাতে পারবে
- উপাদান: ইস্পাত, লোহা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম, ইনভার
- আদি দৈর্ঘ্য: ১ থেকে ৩০ m
- তাপমাত্রার বৃদ্ধি: ০ থেকে ৮০ K
যা মেপে দেখাবে
- প্রয়োজনীয় ফাঁক (mm)
- দৈর্ঘ্য প্রসারণ (ΔL) (m)
- ক্ষেত্র প্রসারণ সহগ (β) (/K)
- আয়তন প্রসারণ সহগ (γ) (/K)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- শীতকালের ১৫ °C থেকে বৈশাখের ৬০ °C পর্যন্ত তাপমাত্রার বৃদ্ধি ΔT = ৬০ − ১৫ = ৪৫ K। স্লাইডারে ΔT = ৪৫ K বসিয়ে ফাঁকের মান লক্ষ্য করো।
নিজে করে দেখো
- ৩০ m দৈর্ঘ্যের একটি স্প্যান ৪০ K উত্তপ্ত হলে প্রয়োজনীয় ফাঁক যেন ১.২ mm-এর কম (প্রায় ১ mm) থাকে: এমন একটি পদার্থ বেছে নাও।
ইঙ্গিত
ইনভারের দৈর্ঘ্য প্রসারণ সহগ α অত্যন্ত কম (০.৯ × ১০⁻⁶ /K), তাই ৩০ m দৈর্ঘ্যে ৪০ K তাপে প্রসারণ হয় মাত্র ১.০৮ mm।
- ১২ m লম্বা ইস্পাতের রেললাইনে সর্বোচ্চ ৫ mm ফাঁক রাখা সম্ভব হলে এটি সর্বোচ্চ কত তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিতে পারবে? (৫ K ধাপে সবচেয়ে বড় মানটি বের করো)।
ইঙ্গিত
৩৫ K বৃদ্ধি পেলে ফাঁক হয় ৪.৬২ mm যা ৫ mm-এর কম। কিন্তু ৪০ K হলে ফাঁক বেড়ে ৫.২৮ mm হয়ে সীমা অতিক্রম করে।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
কঠিন পদার্থের প্রসারণ
তাপ প্রয়োগে কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন বৃদ্ধি পায়। কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ ΔL = αL₀ΔT, যেখানে α হলো উপাদানের দৈর্ঘ্য প্রসারণ সহগ, L₀ আদি দৈর্ঘ্য এবং ΔT হলো তাপমাত্রার বৃদ্ধি। ইস্পাতের α = ১১ × ১০⁻⁶ K⁻¹। ১২ m দৈর্ঘ্যের একটি রেললাইন ৪৫ K উত্তপ্ত হলে দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায় প্রায় ৫.৯৪ mm (প্রায় ৬ mm)। যদি দুটি পাতের মাঝে এই ফাঁক না রাখা হতো, তবে প্রচণ্ড তাপে প্রসারিত রেললাইন বেঁকে গিয়ে মারাত্মক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটত। ক্ষেত্র প্রসারণ সহগ দৈর্ঘ্যের দ্বিগুণ (β = ২α) এবং আয়তন প্রসারণ সহগ তিনগুণ (γ = ৩α)। যমুনা সেতু ও পদ্মা সেতুর গার্ডারের মাঝে খাঁজকাটা এক্সপানশন জয়েন্ট রাখা হয় এবং বৈদ্যুতিক সঞ্চালন তার কিছুটা ঝুলিয়ে টানা হয় যাতে শীতকালে সংকুচিত হয়ে ছিঁড়ে না যায়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকের ধারণা কঠিন ধাতু তাপে প্রসারিত হয় না। ধাতুগুলোর প্রসারণ সহগ ছোট (১০⁻⁶ ক্রমের) হলেও ১২ মিটারের মতো লম্বা পাতে প্রায় ৬ mm প্রসারণ ঘটে, যা রেললাইন বাঁকিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। আবার অনেকে মনে করে প্রসারণ শুধু তাপমাত্রার পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সমীকরণ বলে প্রসারণ আদি দৈর্ঘ্যেরও সমানুপাতিক: রেল যত লম্বা হবে, ফাঁক তত বেশি রাখতে হবে।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- কঠিন ধাতু তাপে এত কম প্রসারিত হয় যে কোনো ফাঁক রাখার প্রয়োজন হয় না
- রেললাইনের ফাঁক শুধু তাপমাত্রার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে, রেলের আদি দৈর্ঘ্যের ওপর নয়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- যমুনা সেতুতে এক্সপানশন জয়েন্ট: গ্রীষ্মের চড়া রোদে সেতুর ধাতব গার্ডার প্রসারিত হলে যেন কংক্রিট ফেটে না যায়, সেজন্য স্প্যানগুলোর মাঝে চিরুনির মতো খাঁজকাটা এক্সপানশন জয়েন্ট রাখা হয়।
- বৈদ্যুতিক তার ঝুলিয়ে রাখা: বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিড ও পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন তার কিছুটা ঝুলিয়ে স্থাপন করা হয়, যাতে শীতকালের ঠান্ডায় তার সংকুচিত হয়ে টান লেগে ছিঁড়ে না যায় বা খুঁটি ভেঙে না পড়ে।