প্রকৃতির পদার্থ তাপ, চাপ বা অন্য পদার্থের সংস্পর্শে বদলায়। এই পরিবর্তন দুই রকম: ভৌত ও রাসায়নিক। ভৌত পরিবর্তন: পদার্থের রাসায়নিক গঠন অপরিবর্তিত রেখে তার অবস্থা, আকার বা আকৃতির পরিবর্তনকে ভৌত পরিবর্তন বলে।
রাসায়নিক বিক্রিয়াকে কয়েকভাবে ভাগ করা যায়: দিক অনুযায়ী একমুখী ও উভমুখী, তাপের পরিবর্তন অনুযায়ী তাপ উৎপাদী ও তাপহারী, আর ইলেকট্রন স্থানান্তর অনুযায়ী রেডক্স ও ননরেডক্স। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন দেখি। ১.
আর্দ্র বিশ্লেষণ বা পানি বিশ্লেষণ · পানিযোজন · সমানুকরণ · পলিমারকরণ
পড়ে নাও
কিছু বিক্রিয়া জারণ-বিজারণ (Redox) ও অ-জারণ-বিজারণ (Non-Redox) শ্রেণিতে পড়ে না। এগুলো বিশেষ ধরনের বিক্রিয়া। বিক্রিয়ক হিসেবে পানি অন্য যৌগের সাথে বিক্রিয়া করে উৎপাদ দিলে তাকে আর্দ্র বিশ্লেষণ বিক্রিয়া বলে।
বিভিন্ন প্রকারের জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া · জারণ সংখ্যা ও এর হিসাব · জারণ-বিজারণের ইলেকট্রনীয় মতবাদ · জারণ অর্ধ ও বিজারণ অর্ধ বিক্রিয়া: জারণ-বিজারণ যুগপৎ ঘটে
পড়ে নাও
রেডক্স শব্দটি এসেছে reduction এর 'red' ও oxidation এর 'ox' মিলিয়ে। এ ধরনের বিক্রিয়ায় একটি বিক্রিয়ক ইলেকট্রন ত্যাগ করে এবং অন্যটি তা গ্রহণ করে।
আমাদের চারপাশে প্রতিদিন যা ঘটে, তার অনেকগুলোই রাসায়নিক বিক্রিয়া। কয়েকটি পরিচিত উদাহরণ: লোহায় মরিচা: ছুরি, কাঁচি বা দা খোলা বাতাসে রাখলে লোহা অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে।
আমাদের চারপাশের অনেক জিনিস রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে প্রতিনিয়ত নষ্ট বা ক্ষয় হচ্ছে। এই বাড়ির কাজে নিজের ঘরে এমন পরিবর্তন খুঁজে বের করে কোন বিক্রিয়ার কারণে তা ঘটছে, তা ব্যাখ্যা করতে হয়।
মরিচা পড়া হলো লোহার সঙ্গে বাতাসের অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্পের বিক্রিয়া: 4Fe+3O₂+6H₂O⟶ 4Fe(OH)₃; এরপর এই ফেরিক হাইড্রোক্সাইড থেকে পানিযুক্ত ফেরিক অক্সাইড বা মরিচা (Fe₂O₃·nH₂O) তৈরি হয়।
যেকোনো বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক থেকে উৎপাদ তৈরি হয়, কিন্তু সব বিক্রিয়ার সময় সমান নয়। কিছু বিক্রিয়া 1 সেকেন্ডেরও কম সময়ে শেষ হয়, আবার কিছুতে অনেক বছর লাগে।
রাসায়নিক বিক্রিয়া সব সময় একই গতিতে হয় না। কিছু বিক্রিয়া খুব দ্রুত হয়, আবার কিছু হয় খুব ধীরে। বিক্রিয়া কত তাড়াতাড়ি হচ্ছে তার পরিমাপকে বলা হয় বিক্রিয়ার হার। এটি নির্ভর করে বিভিন্ন বিষয়ের উপর, যেমন তাপমাত্রা।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা অম্ল ও ক্ষারের মধ্যে প্রশমন বিক্রিয়া এবং বিক্রিয়ার হার পর্যবেক্ষণ করব। লেবুর রস হলো একটি প্রাকৃতিক অম্ল (সাইট্রিক এসিড), আর চুনের পানি হলো ক্ষার (ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড, Ca(OH)₂)।
তুঁতে হলো কপার সালফেট (CuSO₄)। এটি একটি নীল রঙের দ্রবণ। যখন এর সঙ্গে ক্ষার, যেমন সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH), যোগ করা হয়, তখন একটি নতুন পদার্থ তৈরি হয় যা পানিতে অদ্রবণীয়। এটি পাত্রের তলায় তলানি হিসেবে জমা হয়।
যখন একটি অম্ল এবং একটি ক্ষারক মিশে পরস্পরকে প্রশমিত করে তখন লবণ ও পানি উৎপন্ন হয়। এ ধরনের বিক্রিয়াকে বলা হয় প্রশমন বিক্রিয়া। এটি একটি নন-রেডক্স বিক্রিয়া, কারণ এতে ইলেকট্রন স্থানান্তর হয় না।
ভৌত পরিবর্তন ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার পার্থক্য করতে পারবে।
পদার্থের পরিবর্তনকে বিশ্লেষণ করে রাসায়নিক বিক্রিয়া শনাক্ত করতে পারবে।
রাসায়নিক বিক্রিয়ার শ্রেণিবিভাগ রেডক্স/ননরেডক্স, একমুখী/উভমুখী, তাপ উৎপাদী/তাপ হারী )করতে পারবে এবং বিক্রিয়ার প্রকার শনাক্ত করতে পারবে।
বিক্রিয়ায় উৎপন্ন উৎপাদের পরিমাণ লা-শাটেলিয়ারের নীতির সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে পারবে।
পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে জারণ- বিজারণ বিক্রিয়ার প্রকার শনাক্ত করতে পারবে।
বাস্তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংঘটিত বিক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারবে।
বাস্তব ক্ষেত্রে সংঘটিত ক্ষতিকারক বিক্রিয়াসমূহ নিয়ন্ত্রণ বা রোধের উপায় নির্ধারণ করতে পারবে (লোহার তৈরি জিনিসের মরিচাপড়া রোধের যথাযথ উপায় নির্ধারণ করতে পারবে)।
রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট হারের তুলনা করতে পারবে।
বিভিন্ন পদার্থ ব্যবহার করে বিক্রিয়ার গতিবেগ বা হার পরীক্ষা ও তুলনা করতে পারবে।
অম্ল-ক্ষারক প্রশমন বিক্রিয়া এবং অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়া প্রদর্শন করতে পারবে।
পরীক্ষার সাহায্যে বিক্রিয়ার হারের ভিন্নতা প্রদর্শন করতে পারবে।
দৈনন্দিন কাজে ধাতব বস্তু ব্যবহারে সচেতনতা প্রদর্শন করবে।
একই দ্রাবকে দুটি দ্রবণীয় যৌগ মিশ্রিত করলে যদি তাদের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে কোনো একটি উৎপাদ অদ্রবণীয় কঠিন অবস্থায় পাত্রের তলায় তলানি হিসেবে জমা হয়, তবে সেই বিক্রিয়াকে অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়া বলে।
খ
লোহায় মরিচা পড়া একটি রাসায়নিক পরিবর্তন কেন — ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
বাতাসের অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্পের উপস্থিতিতে লোহা রাসায়নিকভাবে বিক্রিয়া করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মবিশিষ্ট আর্দ্র ফেরিক অক্সাইড (Fe₂O₃·nH₂O) বা মরিচা তৈরি করে। মরিচার ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম মূল লোহার ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সাধারণ ভৌত উপায়ে মরিচাকে আর পূর্বের লোহায় ফিরিয়ে আনা যায় না; তাই লোহায় মরিচা পড়া একটি স্থায়ী রাসায়নিক পরিবর্তন।
গ
পাত্র-১ এ সংঘটিত বিক্রিয়াটির সমীকরণ লেখো এবং এটি কেন একটি নন-রেডক্স (non-redox) বিক্রিয়া তা জারণ সংখ্যার ভিত্তিতে প্রমাণ করো।
উত্তর দেখাও
পাত্র-১ এ সংঘটিত বিক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
FeSO₄(aq) + 2NaOH(aq) → Fe(OH)₂(s)↓ + Na₂SO₄(aq)
জারণ সংখ্যার বিশ্লেষণ:
১. বিক্রিয়ক FeSO₄-এ Fe-এর জারণ সংখ্যা +২ এবং উৎপাদ Fe(OH)₂-এ Fe-এর জারণ সংখ্যা +২ (অপরিবর্তিত)।
২. বিক্রিয়ক NaOH-এ Na-এর জারণ সংখ্যা +১ এবং উৎপাদ Na₂SO₄-এ Na-এর জারণ সংখ্যা +১ (অপরিবর্তিত)।
৩. সালফেট মূলকে S (+৬) ও O (−২) এবং হাইড্রোক্সাইড মূলকে O (−২) ও H (+১) এর জারণ সংখ্যা বিক্রিয়ার উভয় পাশেই অপরিবর্তিত থাকে।
যেহেতু বিক্রিয়াটিতে কোনো পরমাণুরই জারণ সংখ্যার হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটেনি অর্থাৎ কোনো ইলেকট্রন স্থানান্তর হয়নি, তাই এটি একটি নন-রেডক্স বিক্রিয়া।
ঘ
পাত্র-২ এ সংঘটিত বিক্রিয়াটিতে জারণ ও বিজারণ একই সাথে যুগপৎ সংঘটিত হয় — ইলেকট্রনীয় মতবাদের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
পাত্র-২ এ লোহা ও কপার সালফেটের প্রতিস্থাপন বিক্রিয়াটি হলো:
Fe(s) + CuSO₄(aq) → FeSO₄(aq) + Cu(s)
দর্শক সালফেট আয়ন (SO₄²⁻) বাদ দিয়ে সমীকরণটির আয়নিক রূপ:
Fe(s) + Cu²⁺(aq) → Fe²⁺(aq) + Cu(s)
ইলেকট্রনীয় মতবাদের আলোকে বিক্রিয়াটির বিশ্লেষণ:
১. জারণ অর্ধ-বিক্রিয়া: বিক্রিয়ায় ধাতব লোহা (Fe) পরমাণু ২টি ইলেকট্রন ত্যাগ করে ফেরাস আয়নে (Fe²⁺) পরিণত হয়। ইলেকট্রন ত্যাগের এই প্রক্রিয়াটি হলো জারণ। সমীকরণ: Fe → Fe²⁺ + 2e⁻ (জারণ সংখ্যা ০ থেকে বেড়ে +২ হয়)।
২. বিজারণ অর্ধ-বিক্রিয়া: দ্রবণের কিউপ্রিক আয়ন (Cu²⁺) লোহার বর্জিত ওই ২টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে ধাতব কপার (Cu) পরমাণুতে পরিণত হয়ে পেরেকের গায়ে জমা হয়। ইলেকট্রন গ্রহণের এই প্রক্রিয়াটি হলো বিজারণ। সমীকরণ: Cu²⁺ + 2e⁻ → Cu (জারণ সংখ্যা +২ থেকে কমে ০ হয়)।
যুগপৎ ঘটার মূল্যায়ন: রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো পরমাণু তখনই ইলেকট্রন ত্যাগ করতে পারে যখন সেই ইলেকট্রন গ্রহণ করার মতো কোনো গ্রাহক উপস্থিত থাকে। উদ্দীপকের বিক্রিয়ায় Fe দ্বারা ইলেকট্রন বর্জন এবং Cu²⁺ আয়ন দ্বারা সেই ইলেকট্রন গ্রহণ একই সাথে একই মুহূর্তে ঘটে। একটি ছাড়া অন্যটি ঘটা অসম্ভব। অতএব প্রমাণিত হয় যে, পাত্র-২ এর বিক্রিয়াটিতে জারণ ও বিজারণ যুগপৎ সংঘটিত হয়।