কণার গতিতত্ত্ব হলো পদার্থের কণাগুলোর গতিশক্তি ও পারস্পরিক আকর্ষণের সাহায্যে কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থা ব্যাখ্যা করার তত্ত্ব। বাইরে থেকে কোনো বস্তু স্থির দেখালেও তার ভেতরের কণাগুলো স্থির থাকে না।
পদার্থ হলো এমন বস্তু যার ভর আছে এবং যা স্থান দখল করে। পদার্থের কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থার পার্থক্য বুঝতে কণার দূরত্ব, আন্তঃকণা আকর্ষণ বল এবং চলাচল একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
ব্যাপন হলো কোনো পদার্থের কণার উচ্চ ঘনমাত্রার স্থান থেকে নিম্ন ঘনমাত্রার স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে সমভাবে মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া। কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় মাধ্যমে ব্যাপন ঘটতে পারে।
মোম, আইসক্রিম, পানি ও ন্যাপথালিনে তাপ দেওয়া বা তাপ সরানোর ফল তুলনা করলে অবস্থার পরিবর্তন বোঝা যায়। তবে সব পদার্থ একই তাপমাত্রায় বা একই পথে অবস্থা পরিবর্তন করে না। বিশুদ্ধ পদার্থ এবং মিশ্রণের আচরণও আলাদা হতে পারে।
তাপের প্রভাবে পদার্থের তাপমাত্রা এবং ভৌত অবস্থা—দুটিই পরিবর্তিত হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অবস্থার পরিবর্তন এক ঘটনা নয়। তাপ গ্রহণ করে একই অবস্থায় তাপমাত্রা বাড়লে কণার গতিশক্তি বাড়ে।
ব্যাপন হার বলতে কণাগুলো কত দ্রুত কোনো মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা বোঝায়। তুলনীয় অবস্থায় একই পরিমাণ ছড়িয়ে পড়তে কম সময় লাগলে ব্যাপন হার বেশি; বেশি সময় লাগলে হার কম।
এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো ঠান্ডা, স্বাভাবিক ও গরম পানিতে একই পদার্থের কণা ছড়ানোর গতি তুলনা করা। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট একটি রঙিন কঠিন পদার্থ; এর সংকেত KMnO₄।
তাপ প্রয়োগে কঠিন পদার্থ তরলে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে গলন বলে। স্বাভাবিক চাপে বিশুদ্ধ কঠিন পদার্থ যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় গলে, সেটি তার গলনাঙ্ক। বরফ পানির কঠিন অবস্থা; স্বাভাবিক চাপে এর গলনাঙ্ক 0°C।
পাতন হলো কোনো তরলকে তাপ দিয়ে বাষ্পে পরিণত করা এবং সেই বাষ্প শীতল করে আবার তরল হিসেবে সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া। এতে তরল থেকে গ্যাসীয় অবস্থা এবং গ্যাসীয় অবস্থা থেকে তরলে ফেরার দুটি পরিবর্তন পরপর ঘটে।
তাপ দিলে কঠিন পদার্থ তরল হওয়াকে গলন বলে। তরল পদার্থ তাপ ছেড়ে আবার কঠিন হওয়াকে কঠিনীভবন বলে। মোম গরম করে এবং পরে ঠান্ডা করে এই দুটি পরিবর্তন দেখা যায়।
তাপমাত্রা নির্ণয় হলো উপযুক্ত থার্মোমিটার দিয়ে কোনো পদার্থের তাপমাত্রার পাঠ নেওয়া। রাসায়নিক পরীক্ষায় শুধু একটি পাঠ নয়, তাপ দেওয়ার সঙ্গে পাঠ কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রসায়ন বোঝার শুরু হতে পারে নিজের বাড়ির একটি সাধারণ ঘটনা থেকে। শরবতে বরফ গলে কেন, ভাতের হাঁড়ির ঢাকনায় পানি জমে কীভাবে, কিংবা আলমারির ন্যাপথালিন ছোট হয় কেন—এমন প্রশ্ন চারপাশের পরিবর্তনকে বুঝতে সাহায্য করে।
পাবনার একটি বিদ্যালয়ের রসায়ন গবেষণাগারে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসহ দুটি পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করল:
পরীক্ষা-১: ১০০ cm লম্বা একটি অনুভূমিক কাচনলের বাম মুখে গাঢ় অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ সিক্ত তুলা (যা থেকে NH₃ গ্যাস নির্গত হয়, আণবিক ভর 17 g/mol) এবং ডান মুখে গাঢ় হাইড্রোক্লোরিক এসিড সিক্ত তুলা (যা থেকে HCl গ্যাস নির্গত হয়, আণবিক ভর 36.5 g/mol) একই সাথে প্রবেশ করিয়ে দুই মুখ কর্ক দিয়ে আটকে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর কাচনলের ভেতরে কঠিন অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইডের (NH₄Cl) একটি সাদা বলয় সৃষ্টি হলো।
পরীক্ষা-২: দুটি পৃথক বিকারে সমপরিমাণ ঠান্ডা পানি (15 °C) ও গরম পানি (70 °C) নিয়ে উভয় পাত্রে সমান পরিমাণ কঠিন পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের (KMnO₄) স্ফটিক ছেড়ে দেওয়া হলো। দেখা গেল গরম পানির পাত্রটি খুব দ্রুত সম্পূর্ণ বেগুনি বর্ণ ধারণ করল, কিন্তু ঠান্ডা পানিতে রঙ ছড়াতে অনেক বেশি সময় লাগল।
ক
ব্যাপন (diffusion) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
কোনো মাধ্যমে কঠিন, তরল বা গ্যাসীয় বস্তুর স্বতঃস্ফূর্ত ও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাপন বলে।
খ
গরম পানিতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের কণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কেন — কণার গতিতত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
কণার গতিতত্ত্ব অনুসারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে পদার্থের কণাগুলোর গতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং কণাগুলোর ছোটাছুটি ও কম্পন তীব্র হয়। গরম পানির (70 °C) অণুগুলোর গতিশক্তি ঠান্ডা পানির (15 °C) চেয়ে বেশি হওয়ায় তা কঠিন KMnO₄ স্ফটিকের কণাগুলোকে দ্রুত বিশ্লিষ্ট করে চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ব্যাপন হার বৃদ্ধি পাওয়ায় গরম পানিতে রঙ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
গ
উদ্দীপকের পরীক্ষা-১ এ কাচনলের ঠিক মাঝখানে সাদা বলয়টি তৈরি হবে কি? গ্রাহামের ব্যাপন সূত্রের আলোকে গাণিতিকভাবে NH₃ প্রান্ত থেকে বলয় সৃষ্টির দূরত্ব নির্ণয় করো।
উত্তর দেখাও
কাচনলের ঠিক মাঝখানে সাদা বলয় তৈরি হবে না।
গ্রাহামের সূত্রানুসারে ব্যাপন হার আণবিক ভরের বর্গমূলের ব্যস্তানুপাতিক: r₁ ⁄ r₂ = √(M₂ ⁄ M₁)।
এখানে NH₃ এর আণবিক ভর M₁ = 17 g/mol এবং HCl এর আণবিক ভর M₂ = 36.5 g/mol।
কাচনলের মোট দৈর্ঘ্য L = 100 cm। ধরি, NH₃ প্রান্ত থেকে বলয়ের দূরত্ব d₁ এবং HCl প্রান্ত থেকে দূরত্ব d₂ = (100 − d₁)।
সুতরাং, d₁ ⁄ (100 − d₁) = √(36.5 ⁄ 17) = √2.1471 ≈ 1.4653।
বা, d₁ = 1.4653 × (100 − d₁) ⇒ 2.4653 d₁ = 146.53 ⇒ d₁ ≈ 59.44 cm (বা প্রায় 59.4 cm)।
যেহেতু d₁ = 59.4 cm ≠ 50 cm, তাই সাদা বলয়টি কাচনলের ঠিক মাঝখানে তৈরি হবে না, বরং হালকা গ্যাস NH₃ দ্রুত ব্যাপিত হওয়ায় NH₃ প্রান্ত থেকে প্রায় 59.4 cm দূরে অর্থাৎ ভারী গ্যাস HCl প্রান্তের কাছাকাছি বলয়টি গঠিত হবে।
ঘ
'পরীক্ষা-১ এবং পরীক্ষা-২ উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপন সংঘটিত হলেও এর হার নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবকগুলো ভিন্ন'—উদ্দীপকের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের বক্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ। উভয় পরীক্ষাতেই কণার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তার অর্থাৎ ব্যাপন সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু তাদের হার ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে:
১. পরীক্ষা-১ এ প্রভাবক হলো আণবিক ভর (গ্যাসীয় মাধ্যমে ব্যাপন): এখানে উভয় গ্যাসের জন্য তাপমাত্রা ও চাপ সমান ছিল। কিন্তু অ্যামোনিয়া (NH₃, আণবিক ভর 17 g/mol) ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড (HCl, আণবিক ভর 36.5 g/mol) গ্যাসের আণবিক ভর ভিন্ন। গতিতত্ত্ব অনুসারে একই তাপমাত্রায় হালকা কণার গড় বেগ বেশি থাকে। ফলে হালকা NH₃ গ্যাস দ্রুত ব্যাপিত হয়ে প্রায় 59.4 cm অতিক্রম করে এবং ভারী HCl গ্যাস একই সময়ে মাত্র 40.6 cm অতিক্রম করতে পারে। অর্থাৎ এখানে ব্যাপন হার পার্থক্যের মূল কারণ পদার্থের আণবিক ভর।
২. পরীক্ষা-২ এ প্রভাবক হলো তাপমাত্রা (তরল মাধ্যমে ব্যাপন): এখানে উভয় পাত্রেই সমপরিমাণ ও একই কঠিন পদার্থ (KMnO₄) ব্যবহার করা হয়েছিল, তাই কণার আণবিক ভর ছিল অভিন্ন। কিন্তু একটি পাত্রে পানির তাপমাত্রা ছিল 15 °C এবং অন্যটিতে 70 °C। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পানির অণু ও দ্রবীভূত পারম্যাঙ্গানেট কণাগুলোর গতিশক্তি বৃদ্ধি পায়, ফলে গরম পানিতে KMnO₄ দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ এখানে ব্যাপন হার পার্থক্যের নিয়ন্ত্রক ছিল তাপমাত্রা।
সুতরাং দেখা যায়, পরীক্ষা-১ এ ব্যাপন হার নিয়ন্ত্রিত হয়েছে পদার্থের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য 'আণবিক ভর' দ্বারা, আর পরীক্ষা-২ এ ব্যাপন হার নিয়ন্ত্রিত হয়েছে পারিপার্শ্বিক 'তাপমাত্রা' দ্বারা। অতএব উদ্দীপকের উক্তিটি সম্পূর্ণরূপে তাৎপর্যপূর্ণ ও যথার্থ।