রাজশাহীর একটি মডেল স্কুলের পরীক্ষাগারে রসায়ন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কয়েকটি জৈব যৌগের পারস্পরিক রূপান্তরের পরীক্ষা প্রদর্শন করলেন: পরীক্ষা-১: ইথানলকে অতিরিক্ত গাঢ় সালফিউরিক এসিডসহ ১৬০°C–১৭০°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে একটি অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন গ্যাস P প্রস্তুত করা হলো। পরীক্ষা-২: গ্যাস P এর মধ্যে লাল বর্ণের ব্রোমিন দ্রবণ যোগ করায় লাল বর্ণ তাৎক্ষণিকভাবে অপসারিত হয়ে বর্ণহীন সম্পৃক্ত যৌগ Q উৎপন্ন হলো। পরীক্ষা-৩: ইথানলকে সালফিউরিক এসিড মিশ্রিত পটাসিয়াম ডাইক্রোমেট (K₂Cr₂O₇ + H₂SO₄) সহযোগে নিয়ন্ত্রিত জারণ ঘটিয়ে প্রথমে অ্যালডিহাইড R এবং পরবর্তীতে তীব্র ঝাঁজালো গন্ধযুক্ত একটি জৈব এসিড S প্রস্তুত করা হলো।
- ক
জীবাশ্ম জ্বালানি (fossil fuel) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
শত শত মিলিয়ন বছর পূর্বে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ ভূগর্ভস্থ উচ্চ তাপ ও চাপে রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে যে জ্বালানি (যেমন প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোলিয়াম ও কয়লা) সৃষ্টি হয়, তাকে জীবাশ্ম জ্বালানি বলে।
- খ
অ্যালকেনসমূহকে কেন 'প্যারাফিন' বলা হয়? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
ল্যাটিন শব্দ 'প্যারা' (parum) অর্থ কম এবং 'অ্যাফিন' (affinis) অর্থ আসক্তি; অর্থাৎ 'প্যারাফিন' শব্দের অর্থ আসক্তিহীন বা স্বল্প আসক্তিযুক্ত। অ্যালকেনের কার্বন শিকলে কার্বন-কার্বন (C–C) এবং কার্বন-হাইড্রোজেন (C–H) একক সমযোজী সিগমা বন্ধন থাকে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এদের ভাঙতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে সাধারণ তাপমাত্রা ও চাপে অ্যালকেন এসিড, ক্ষার বা সাধারণ জারক-বিজারকের সাথে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নিতে আগ্রহ দেখায় না বলে এদেরকে প্যারাফিন বলা হয়।
- গ
উদ্দীপকের পরীক্ষা-১ ও পরীক্ষা-২ এ সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো সমীকরণসহ দেখাও এবং কীভাবে বিক্রিয়াটি গ্যাস P এর অসম্পৃক্ততা প্রমাণ করে তা বর্ণনা করো।
উত্তর দেখাও
১. পরীক্ষা-১ এর বিক্রিয়া (নিরুদন): ইথানলকে অতিরিক্ত গাঢ় সালফিউরিক এসিডসহ ১৬০°C–১৭০°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে নিরুদন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পানি অপসারিত হয়ে ইথিন (গ্যাস P) উৎপন্ন হয়: CH₃CH₂OH -(গাঢ় H₂SO₄, ১৬০°C–১৭০°C)-> CH₂=CH₂ + H₂O।
২. পরীক্ষা-২ এর বিক্রিয়া (সংযোজন): ইথিন (P) এর মধ্যে লাল ব্রোমিন দ্রবণ যোগ করলে দ্বিবন্ধন ভেঙে সংযোজন বিক্রিয়ায় বর্ণহীন ১,২-ডাইব্রোমোইথেন (যৌগ Q) উৎপন্ন হয়: CH₂=CH₂ + Br₂ (লাল) → CH₂Br–CH₂Br (বর্ণহীন)।
৩. অসম্পৃক্ততার প্রমাণ: সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন (যেমন মিথেন বা ইথেন) সাধারণ অবস্থায় ব্রোমিনের সাথে বিক্রিয়া করে না, ফলে ব্রোমিনের লাল বর্ণ অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু গ্যাস P (ইথিন) ব্রোমিনের লাল দ্রবণের সাথে বিক্রিয়া করে তৎক্ষণাৎ তার লাল বর্ণ বিনষ্ট করে বর্ণহীন যৌগে পরিণত করে। ব্রোমিনের লাল বর্ণ দূরীকরণের এই পরীক্ষাটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে গ্যাস P একটি অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন।
- ঘ
উদ্দীপকের পরীক্ষা-৩ এ যৌগ R ও S তৈরির রাসায়নিক সমীকরণ দাও। খাদ্য সংরক্ষণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে যৌগ S এর উপযোগিতা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
১. যৌগ R ও S তৈরির সমীকরণ: সালফিউরিক এসিড ও পটাসিয়াম ডাইক্রোমেটের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন জায়মান অক্সিজেন [O] ইথানলকে জারিত করে প্রথমে ইথান্যাল (যৌগ R) উৎপন্ন করে: CH₃CH₂OH + [O] -(K₂Cr₂O₇ + H₂SO₄)-> CH₃CHO + H₂O। উৎপন্ন ইথান্যাল (R) পুনরায় জায়মান অক্সিজেন দ্বারা দ্রুত জারিত হয়ে ইথানয়িক এসিড (যৌগ S) তৈরি করে: CH₃CHO + [O] -(K₂Cr₂O₇ + H₂SO₄)-> CH₃COOH।
২. খাদ্য সংরক্ষণে ভূমিকা: ইথানয়িক এসিডের ৪%–১০% জলীয় দ্রবণকে ভিনেগার বলা হয়। বাংলাদেশে গৃহস্থালিতে মাছ, মাংস ও ঐতিহ্যবাহী আচার (যেমন আম, জলপাই ও রসুনের আচার) সংরক্ষণে ভিনেগার ব্যবহৃত হয়। ভিনেগার খাদ্যবস্তুর অম্লত্ব বৃদ্ধি করে pH মান ৩.৫–৪.০ এ নামিয়ে আনে। এই অম্লীয় পরিবেশে খাদ্য পচনকারী ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব বাঁচতে পারে না এবং তাদের বৃদ্ধি ও বিস্তার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
৩. গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক তাৎপর্য: বাংলাদেশে মৌসুমে প্রচুর আম, চালতা, বরই ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়, যা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বল্পমূল্যে হাইড্রোকার্বন ও শিল্পজাত ভিনেগার ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে ঘরে ঘরে আচার ও খাদ্য সংরক্ষণ কারখানা গড়ে তোলা যায়। এটি একদিকে খাদ্যের অপচয় রোধ করে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং অন্যদিকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি করে।