ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পেট্রোলিয়ামের আংশিক পাতন
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ERL) অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামকে ৪০০°C তাপে উত্তপ্ত করে বাষ্প আকারে আংশিক পাতন কলামে প্রবেশ করানো হয়। কলামের নিচে তাপমাত্রা বেশি (৩৫০°C) এবং ওপরের দিকে তাপমাত্রা ক্রমশ কমতে থাকে (২০°C)। হাইড্রোকার্বনের বাষ্প ওপরে ওঠার সময় ট্রে-এর তাপমাত্রা তার স্ফুটনাংকের সমান বা নিচে নামলে তবেই ঘনীভূত হয়ে তরল হয়। যেমন— ১২টি কার্বনযুক্ত কেরোসিন (C₁₂H₂₆, স্ফুটনাংক ২১৬°C) নিচের দিকের ২০০°C তাপমাত্রার ট্রেতেই ঘনীভূত হয়। পেট্রোলের প্রধান উপাদান অকটেনে ৮টি কার্বন পরমাণু থাকে (C₈H₁₈) এবং এর স্ফুটনাংক ১২৬°C। অকটেন বাষ্প কলামের কোন ট্রেতে ঘনীভূত হয়ে তরল হিসেবে জমা হবে?
অকটেন (C₈H₁₈) বাষ্প কলামের কোন ট্রেতে ঘনীভূত হবে?
- নিচের ২০০°C ট্রেতে — স্ফুটনাংক কম হওয়ায় এটি আগে ঘনীভূত হয়ে নিচেই জমা হবে
- ওপরের ১২০°C ট্রেতে — স্ফুটনাংক ১২৬°C হওয়ায় বাষ্প ওপরে উঠে ১২০°C ট্রেতে শীতল হয়ে ঘনীভূত হবে
- কলামের শীর্ষে ২০°C-এও তরল হবে না — পেট্রোল সাধারণ তাপমাত্রায় গ্যাস, তাই শীর্ষ দিয়ে গ্যাস হিসেবে বের হবে
যা বদলাতে পারবে
- কার্বন সংখ্যা (শিকলের দৈর্ঘ্য): ১ থেকে ২৫
- ট্রে-এর তাপমাত্রা: ২০ থেকে ৩৫০ °C
যা মেপে দেখাবে
- স্ফুটনাংক (°C)
- পেট্রোলিয়াম অংশ
- এই ট্রেতে ঘনীভূত হয়?
- আণবিক ভর (g/mol)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- কার্বন সংখ্যা ৮ (অকটেন) নির্বাচন করে ট্রে-এর তাপমাত্রা পরিবর্তন করে দেখো। স্ফুটনাংক (১২৬°C) এবং ট্রে-এর তাপমাত্রার মধ্যে কী সম্পর্ক থাকলে বাষ্প ঘনীভূত হচ্ছে?
নিজে করে দেখো
- ১৫০ °C-এর ট্রেতে তরল হয়ে জমে এমন সবচেয়ে ছোট অ্যালকেন খুঁজে বের করো।
ইঙ্গিত
ট্রের তাপমাত্রা স্ফুটনাঙ্কের সমান বা কম হলে বাষ্প তরল হয়।
- কলামের একেবারে উপরে (২০ °C) যে হাইড্রোকার্বন তখনো গ্যাস থাকে, এমন একটি খুঁজে বের করো — সিলিন্ডারের LPG এরাই।
ইঙ্গিত
ছোট শিকলের অণুর স্ফুটনাঙ্ক কম।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
হাইড্রোকার্বনের শিকলের দৈর্ঘ্য ও স্ফুটনাংক: আংশিক পাতন
অ্যালকেনের কার্বন সংখ্যা (n) যত বাড়ে, তার আণবিক ভর (M = 14n + 2) এবং অণুগুলোর মধ্যকার ভ্যান ডার ওয়ালস আকর্ষণ বল তত বৃদ্ধি পায়। ফলে স্ফুটনাংকও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। আংশিক পাতন কলামে নিচের দিকে তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি (৪০০°C–৩৫০°C) এবং উপরের দিকে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম (২০°C)। স্ফুটনাংক বেশি হলে হাইড্রোকার্বনের বাষ্প বেশি দূর উঠতে পারে না, নিচের উত্তপ্ত ট্রেতেই ঘনীভূত হয়ে যায় (যেমন ১২ কার্বনের কেরোসিনের স্ফুটনাংক ২১৬°C হওয়ায় তা ২০০°C ট্রেতে তরল হয়)। পক্ষান্তরে, ছোট শিকলের হাইড্রোকার্বনের স্ফুটনাংক কম হওয়ায় তা বাষ্প আকারে কলামের আরও ওপরে উঠে শীতল অঞ্চলে ঘনীভূত হয়। অকটেনের (C₈H₁₈) স্ফুটনাংক ১২৬°C; তাই এটি ২০০°C ট্রেতে ঘনীভূত না হয়ে ওপরে উঠতে থাকে এবং ১২০°C ট্রেতে (১২৬°C-এর নিচে) পৌঁছালে ঘনীভূত হয়ে তরল পেট্রোল হিসেবে সংগৃহীত হয়। ১ থেকে ৪ কার্বনের হাইড্রোকার্বনগুলোর (মিথেন, প্রোপেন ইত্যাদি) স্ফুটনাংক ২০°C-এরও কম হওয়ায় তারা কলামের শীর্ষ দিয়ে পেট্রোলিয়াম গ্যাস হিসেবে বের হয়ে যায়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করে যে কম স্ফুটনাংকের পদার্থগুলো আগে বাষ্পীভূত হয় বলে কলামের নিচেই আগে ঘনীভূত হবে। কিন্তু ঘনীভবন ঘটে তখনই, যখন পরিবেশের তাপমাত্রা কোনো পদার্থের স্ফুটনাংকের নিচে বা সমান হয়। ২০০°C তাপমাত্রা অকটেনের স্ফুটনাংক (১২৬°C)-এর চেয়ে অনেক বেশি; তাই এই তাপমাত্রায় অকটেন কখনোই তরল হতে পারে না, বাষ্প হিসেবে ওপরে উঠে যায়। আবার অনেকে 'গ্যাসোলিন' বা পেট্রোলকে গ্যাস ভেবে ভুল করে। কিন্তু অকটেন সাধারণ তাপমাত্রায় তরল (স্ফুটনাংক ১২৬°C)। তাই এটি শীর্ষ দিয়ে গ্যাস হয়ে উড়ে যায় না, বরং কলামের প্রায় ১২০°C তাপমাত্রার পেট্রোল ট্রেতেই তরল হিসেবে জমা হয়।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- কম স্ফুটনাংকের হাইড্রোকার্বন কলামের নিচের গরম অংশে আগে ঘনীভূত হয়
- পেট্রোল সাধারণ তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে এবং পাতন কলামে ঘনীভূত হয় না
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা: চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল আংশিক পাতন করে পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল পৃথক করা হয়, যা দেশের পরিবহন ও কৃষিক্ষেত্রে সেচ পাম্পের জ্বালানি জোগান দেয়।
- সড়ক নির্মাণে বিটুমিন ও গৃহস্থালির এলপিজি (LPG): পাতন কলামের অবশিষ্টাংশ হিসেবে প্রাপ্ত উচ্চ স্ফুটনাংকের বিটুমিন (পিচ) পদ্মা সেতু অ্যাপ্রোচ রোড ও জাতীয় মহাসড়ক কার্পেটিংয়ে ব্যবহৃত হয়; আর শীর্ষ থেকে সংগৃহীত নিম্ন স্ফুটনাংকের পেট্রোলিয়াম গ্যাস সিলিন্ডারজাত করে এলপিজি হিসেবে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়।