রাজশাহীর একটি বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান পরীক্ষাগারে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা দুটি ভিন্ন তড়িৎ রাসায়নিক পরীক্ষা সম্পন্ন করল: কোষ-১: একটি তাজা লেবুর রসে একটি দস্তার (Zn) পাত এবং একটি তামার (Cu) পাত সমান্তরালভাবে প্রবেশ করিয়ে বহিঃস্থ তারে একটি এলইডি (LED) বাতি ও ভোল্টমিটার যুক্ত করা হলো। ভোল্টমিটারে ১.১০ V বিভব পার্থক্য দেখা গেল। কোষ-২: একটি কাচের পাত্রে সোডিয়াম ক্লোরাইডের গাঢ় জলীয় দ্রবণ (ব্রাইন) নিয়ে দুটি গ্রাফাইট দণ্ড ডুবিয়ে ব্যাটারির সাহায্যে তড়িৎ বিশ্লেষণ ঘটানো হলো। (দেওয়া আছে: লেবুর কোষে Zn ও Cu তড়িৎদ্বারের সমন্বয়ে গঠিত একক কোষের বিভব ১.১০ V; এলইডি বাতিটি প্রজ্বলনের জন্য ন্যূনতম ২.৫ V ভোল্টেজ প্রয়োজন)।
- ক
তড়িৎ বিশ্লেষ্য (electrolyte) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
যেসব রাসায়নিক পদার্থ গলিত অবস্থায় বা উপযুক্ত দ্রাবকে দ্রবীভূত অবস্থায় আয়ন সৃষ্টির মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবহন করে এবং বিদ্যুৎ পরিবহনের সাথে সাথে রাসায়নিকভাবে বিশ্লিষ্ট হয়ে নতুন পদার্থে পরিণত হয়, তাদেরকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য বলে।
- খ
কোষ-১ এ জিংক পাতটি ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার (অ্যানোড) হিসেবে কাজ করে কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
তড়িৎ রাসায়নিক সক্রিয়তা সিরিজে জিংক (Zn) কপারের (Cu) উপরে অবস্থিত হওয়ায় জিংক কপার অপেক্ষা অধিক সক্রিয় ধাতু। লেবুর রসের সাইট্রিক এসিডে জিংক সহজেই ইলেকট্রন ত্যাগ করে জারিত হয়: Zn(s) → Zn²⁺(aq) + 2e⁻। নির্গত ইলেকট্রনগুলো জিংক পাতে পুঞ্জীভূত হয় বলে জিংক পাত ঋণাত্মক আধানে আহিত হয়। গ্যালভানিক কোষে যে তড়িৎদ্বারে জারণ ঘটে তাকে অ্যানোড বলে; ফলে কোষ-১ এ জিংক পাত ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার বা অ্যানোড হিসেবে ক্রিয়া করে।
- গ
উদ্দীপকের কোষ-২ এর তড়িৎ বিশ্লেষণে অ্যানোড ও ক্যাথোডে সংঘটিত বিক্রিয়াগুলো সমীকরণসহ দেখাও এবং উৎপাদসমূহ শনাক্ত করো।
উত্তর দেখাও
সোডিয়াম ক্লোরাইডের গাঢ় জলীয় দ্রবণে (ব্রাইন) Na⁺, Cl⁻, H⁺ এবং OH⁻ আয়ন বিদ্যমান থাকে। ১. অ্যানোডে সংঘটিত বিক্রিয়া (জারণ): ধনাত্মক অ্যানোডের দিকে Cl⁻ ও OH⁻ আকৃষ্ট হয়। দ্রবণে ক্লোরাইড আয়নের উচ্চ ঘনমাত্রার কারণে OH⁻ এর পরিবর্তে Cl⁻ আয়ন প্রাধান্য পেয়ে ইলেকট্রন ত্যাগ করে এবং ক্লোরিন গ্যাস (Cl₂) উৎপন্ন করে: 2Cl⁻(aq) → Cl₂(g) + 2e⁻।
২. ক্যাথোডে সংঘটিত বিক্রিয়া (বিজারণ): ঋণাত্মক ক্যাথোডের দিকে Na⁺ ও H⁺ আকৃষ্ট হয়। সক্রিয়তা সিরিজে হাইড্রোজেন Na এর নিচে অবস্থিত হওয়ায় H⁺ আয়ন সহজে ইলেকট্রন গ্রহণ করে বিজারিত হয় এবং হাইড্রোজেন গ্যাস (H₂) উৎপন্ন করে: 2H⁺(aq) + 2e⁻ → H₂(g)।
৩. দ্রবণে অবশিষ্ট উৎপাদ: দ্রবণে অপরিবর্তিত Na⁺ এবং OH⁻ আয়ন পরস্পর যুক্ত হয়ে কস্টিক সোডা বা সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH) তৈরি করে। সুতরাং, অ্যানোডে ক্লোরিন গ্যাস (Cl₂), ক্যাথোডে হাইড্রোজেন গ্যাস (H₂) এবং দ্রবণে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH) উৎপন্ন হয়।
- ঘ
একটি একক কোষ-১ দিয়ে এলইডি বাতিটি জ্বালানো সম্ভব কি? কীভাবে ন্যূনতম সংখ্যক কোষ-১ সমন্বয় করে বাতিটি জ্বালানো যাবে এবং এই প্রক্রিয়ায় শক্তি রূপান্তরের তাৎপর্য গাণিতিক বিশ্লেষণসহ মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখাও
১. একক কোষ দিয়ে বাতি জ্বালানোর সম্ভাব্যতা: উদ্দীপক অনুসারে একটি একক কোষ-১ এর বিভব পার্থক্য V₁ = ১.১০ V। কিন্তু এলইডি (LED) বাতিটি প্রজ্বলনের জন্য ন্যূনতম ২.৫ V ভোল্টেজ প্রয়োজন। যেহেতু ১.১০ V < ২.৫ V, তাই একটিমাত্র কোষ-১ দিয়ে বাতিটি জ্বালানো সম্ভব নয়।
২. ন্যূনতম কোষের সংখ্যা নির্ণয়: কোষগুলোকে শ্রেণি সমবায়ে (series combination) যুক্ত করলে মোট বিভব যোগ হয়: V_total = n × V₁। বাতিটি জ্বালাতে প্রয়োজনীয় শর্ত: n × ১.১০ V ≥ ২.৫ V বা, n ≥ ২.৫ ⁄ ১.১০ ≈ ২.২৭। যেহেতু কোষের সংখ্যা পূর্ণসংখ্যা হতে হবে, তাই বাতিটি জ্বালাতে ন্যূনতম ৩টি কোষ-১ শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করতে হবে। ৩টি কোষ শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করলে প্রাপ্ত মোট ভোল্টেজ = ৩ × ১.১০ V = ৩.৩০ V, যা প্রয়োজনীয় ২.৫ V অপেক্ষা বেশি। ফলে বাতিটি উজ্জ্বলভাবে জ্বলবে।
৩. শক্তি রূপান্তরের মূল্যায়ন: লেবু কোষে সাইট্রিক এসিডের উপস্থিতিতে জিংকের জারণ ও হাইড্রোজেনের বিজারণের ফলে রাসায়নিক শক্তি সরাসরি বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং বহিঃস্থ বর্তনীতে এলইডি বাতিতে সেই বিদ্যুৎশক্তি আলোকশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই পরীক্ষাটি প্রমাণ করে যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উপায়ে কার্যকর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার সম্ভব।