লেবু ব্যাটারি: সক্রিয়তার ব্যবধান ও কোষের সমবায়
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
বিজ্ঞান মেলায় নবম শ্রেণির তানভীর একটি লেবুতে জিংক (Zn) ও তামার (Cu) পাত গুঁজে একটি লেবু কোষ তৈরি করল। ভোল্টমিটারে মেপে দেখা গেল এই একক কোষ থেকে ১.১০ V ভোল্টেজ পাওয়া যায়। কিন্তু মেলায় একটি এলইডি (LED) বাতি জ্বালাতে কমপক্ষে ৩.০০ V ভোল্টেজ প্রয়োজন। তানভীর যদি একই রকম ৩টি লেবু কোষকে তার দিয়ে শ্রেণি সমবায়ে (series) যুক্ত করে, তবে মোট কত ভোল্টেজ পাওয়া যাবে?
৩টি লেবু কোষ শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করলে মোট কত ভোল্টেজ পাওয়া যাবে?
- ১.১০ V — কোষ বাড়ালেও ভোল্টেজ বাড়ে না, কারণ একই ধাতু (Zn ও Cu) ব্যবহার করা হয়েছে
- ৩.৩০ V — শ্রেণি সমবায়ে প্রতিটি কোষের ভোল্টেজ যোগ হয় (৩ × ১.১০ V = ৩.৩০ V)
- ০.৩৭ V — শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করলে মোট ভোল্টেজ কোষগুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে কমে যায় (১.১০ V ÷ ৩)
যা বদলাতে পারবে
- ১ম তড়িৎদ্বার: ম্যাগনেসিয়াম (Mg), অ্যালুমিনিয়াম (Al), জিংক (Zn), আয়রন / লোহা (Fe), লেড / সীসা (Pb), কপার / তামা (Cu), সিলভার / রূপা (Ag)
- ২য় তড়িৎদ্বার: ম্যাগনেসিয়াম (Mg), অ্যালুমিনিয়াম (Al), জিংক (Zn), আয়রন / লোহা (Fe), লেড / সীসা (Pb), কপার / তামা (Cu), সিলভার / রূপা (Ag)
- কোষের সংখ্যা (শ্রেণি সমবায়): ১ থেকে ১০
যা মেপে দেখাবে
- মোট ভোল্টেজ (V)
- প্রতি কোষের ভোল্টেজ (V)
- অ্যানোড (ঋণাত্মক মেরু)
- ক্যাথোড (ধনাত্মক মেরু)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- কোষের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩ করো। প্রতিটি লেবু কোষের ভোল্টেজ কি মোট ভোল্টেজের সাথে যোগ হচ্ছে?
- ১ম তড়িৎদ্বার পরিবর্তন করে দেখো। ধাতুর সক্রিয়তার পার্থক্য বেশি হলে ভোল্টেজ বাড়ে, নাকি কমে? দুটি একই ধাতু নিলে কী ঘটে?
নিজে করে দেখো
- মাত্র দুটি (বা একটি) কোষ দিয়ে অন্তত ৩ V তৈরি করে LED জ্বালাও। কোন ধাতুর জোড়া লাগবে?
ইঙ্গিত
সক্রিয়তা সিরিজে দুটি ধাতুর দূরত্ব যত বেশি, প্রতি কোষে ভোল্টেজ তত বেশি।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
গ্যালভানিক কোষের তড়িৎচালক বল (EMF) ও শ্রেণি সমবায়
একটি গ্যালভানিক কোষে (যেমন লেবু ব্যাটারি) দুটি ভিন্ন সক্রিয়তার ধাতব পাতকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণে (লেবুর সাইট্রিক অ্যাসিড) ডুবালে রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সক্রিয়তা সিরিজে (reactivity series) যে ধাতু উপরে থাকে (অধিক সক্রিয়, যেমন Zn), তা সহজে ইলেকট্রন ত্যাগ করে জারিত হয় এবং অ্যানোড (ঋণাত্মক মেরু) হিসেবে কাজ করে। কম সক্রিয় ধাতু (যেমন Cu) ক্যাথোড (ধনাত্মক মেরু) হিসেবে কাজ করে এবং সেখানে বিজারণ ঘটে। দুই ধাতুর প্রমাণ বিজারণ বিভবের পার্থক্যই হলো কোষের ভোল্টেজ বা তড়িৎচালক বল (E°cell = +০.৩৪ - (-০.৭৬) = ১.১০ V)। ধাতুর সক্রিয়তার ব্যবধান যত বেশি হয়, ভোল্টেজও তত বেশি হয়। আর যখন একাধিক কোষকে শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করা হয়, তখন প্রতিটির ভোল্টেজ যোগ হয়ে মোট ভোল্টেজ বৃদ্ধি পায় (৩ × ১.১০ V = ৩.৩০ V)। দুটি একই ধাতু নিলে কোনো বিভব পার্থক্য তৈরি হয় না, ফলে ভোল্টেজ শূন্য হয়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করে শ্রেণি সমবায়ে কোষের সংখ্যা বাড়ালেও ভোল্টেজ বাড়ে না কিংবা ভোল্টেজ কোষগুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে কমে যায়। বাস্তবে রোধের ক্ষেত্রে ভোল্টেজ ভাগ হলেও তড়িৎ উৎসের ক্ষেত্রে শ্রেণি সমবায়ে প্রতিটি কোষের রাসায়নিক শক্তি নতুন ইলেকট্রন প্রবাহের চাপ (তড়িৎচালক বল) যোগ করে। তাই ৩টি কোষের প্রতিটির ১.১০ V যোগ হয়ে মোট ভোল্টেজ ৩.৩০ V হয়। আবার দুটি ভিন্ন ধাতু ছাড়া কেবল অ্যাসিডের সংস্পর্শে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না—সক্রিয়তার ব্যবধানই ভোল্টেজ সৃষ্টির মূল কারণ।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- কোষের সংখ্যা বাড়ালেও শ্রেণি সমবায়ে ব্যাটারির মোট ভোল্টেজ বাড়ে না
- শ্রেণি সমবায়ে একাধিক কোষ যুক্ত করলে মোট ভোল্টেজ ভাগ হয়ে কমে যায়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- সৌরবিদ্যুৎ ও আইপিএসে ব্যাটারি কোষের শ্রেণি সমবায় — বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও চরাঞ্চলে সোলার হোম সিস্টেম (SHS) ও আইপিএসে (IPS) ১২ V-এর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি লেড-অ্যাসিড কোষে (cell) লেড (Pb) ও লেড অক্সাইড (PbO₂) তড়িৎদ্বারের বিভব পার্থক্য প্রায় ২.০ V। এমন ৬টি কোষকে শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করে প্রয়োজনীয় ১২ V ভোল্টেজ পাওয়া যায়, যা রাতে বাতি ও ফ্যান চালাতে কাজ করে।
- বিজ্ঞান শিক্ষা ও জরুরি সংকেতে ফল ব্যাটারি — বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে বিজ্ঞান মেলায় শিক্ষার্থীরা দেশি লেবু, বাতাবি লেবু বা কামরাঙ্গার রসে জিংক ও তামার পাত গুঁজে ফল ব্যাটারি তৈরি করে। একটি লেবু কোষে ১.১০ V পাওয়া গেলেও ৩টি বা ৪টি লেবু কোষ শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করে ৩.৩০ V থেকে ৪.৪০ V তৈরি করা যায়, যা দিয়ে এলইডি বাতি জ্বালানো ও ক্যালকুলেটর চালানো সম্ভব হয়।