বগুড়ার একটি বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান পরীক্ষাগারে রসায়ন শিক্ষক পর্যায় সারণির ৩য় পর্যায়ের তিনটি ধারাবাহিক ধাতব মৌল P, Q ও R প্রদর্শন করলেন, যাদের পারমাণবিক সংখ্যা যথাক্রমে ১১, ১২ ও ১৩। তিনি শিক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণ করালেন যে মৌল তিনটি সাধারণ পানি ও এসিডের সাথে ভিন্ন তীব্রতায় বিক্রিয়া প্রদর্শন করে এবং এদের পারমাণবিক ব্যাসার্ধেও ধারাবাহিক পার্থক্য বিদ্যমান।
- ক
মেন্ডেলিফের মূল পর্যায় সূত্রটি লেখো।
উত্তর দেখাও
মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক ভর বৃদ্ধির সাথে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়।
- খ
ইলেকট্রন বিন্যাস 1s² হওয়া সত্ত্বেও হিলিয়ামকে ২য় গ্রুপে না রেখে ১৮ নম্বর গ্রুপে স্থান দেওয়া হয়েছে কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
হিলিয়ামের (He) ইলেকট্রন বিন্যাস 1s² হওয়ায় ইলেকট্রন বিন্যাসের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী একে গ্রুপ ২-এর মৃৎক্ষার ধাতুদের সাথে রাখা যেত। কিন্তু হিলিয়ামের প্রথম ও একমাত্র শক্তিস্তরটি সর্বোচ্চ দুটি ইলেকট্রন ধারণ করে সম্পূর্ণ পূর্ণ (স্থিতিশীল ডুপ্লেট) থাকায় এটি তীব্রভাবে নিষ্ক্রিয় এবং কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না। অন্যদিকে গ্রুপ ২-এর মৌলসমূহ তীব্র সক্রিয় ধাতু। তাই হিলিয়ামের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম অন্যান্য নিষ্ক্রিয় গ্যাসসমূহের (Ne, Ar ইত্যাদি) সাথে হুবহু মিলে যাওয়ায় একে গ্রুপ ২-এ না রেখে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের গ্রুপ ১৮-তে স্থান দেওয়া হয়েছে।
- গ
ইলেকট্রন বিন্যাসের মাধ্যমে আধুনিক পর্যায় সারণিতে উদ্দীপকের R মৌলটির পর্যায় ও গ্রুপ নির্ণয় করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকে R মৌলটির পারমাণবিক সংখ্যা ১৩, অর্থাৎ মৌলটি হলো অ্যালুমিনিয়াম (Al)। ইলেকট্রন বিন্যাস: Al (13) = 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p¹
পর্যায় নির্ণয়: কোনো মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাসে সর্ববহিঃস্থ প্রধান শক্তিস্তরের নম্বরই হলো তার পর্যায় নম্বর। অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রধান শক্তিস্তর n = ৩। সুতরাং মৌলটি পর্যায় সারণির ৩য় পর্যায়ের মৌল।
গ্রুপ নির্ণয়: নিয়ম অনুসারে, কোনো মৌলের সর্ববহিঃস্থ প্রধান শক্তিস্তরে যদি কেবল s ও p উপস্তর থাকে, তবে ঐ s ও p উপস্তরের মোট ইলেকট্রন সংখ্যার সাথে ১০ যোগ করে গ্রুপ সংখ্যা নির্ধারিত হয়। এখানে বহিঃস্থ ৩য় শক্তিস্তরে ইলেকট্রন সংখ্যা = ২ (3s-এ) + ১ (3p-এ) = ৩। অতএব, গ্রুপ সংখ্যা = ৩ + ১০ = ১৩। সুতরাং, আধুনিক পর্যায় সারণিতে R (Al) মৌলটির অবস্থান হলো ৩য় পর্যায় এবং ১৩ নম্বর গ্রুপ।
- ঘ
উদ্দীপকের P, Q ও R মৌল তিনটির পারমাণবিক আকার এবং পানির সাথে বিক্রিয়াশীলতার তুলনামূলক পর্যায়বৃত্ত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের মৌল তিনটি হলো ৩য় পর্যায়ের সোডিয়াম (₁₁P বা Na), ম্যাগনেসিয়াম (₁₂Q বা Mg) এবং অ্যালুমিনিয়াম (₁₃R বা Al)।
১. পারমাণবিক আকারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ: মৌল তিনটি একই পর্যায়ে (পর্যায় ৩) অবস্থিত। একই পর্যায়ে বাম থেকে ডানে গেলে নতুন কোনো শক্তিস্তর যুক্ত হয় না, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা (Na: +১১, Mg: +১২, Al: +১৩) এবং বহিঃস্থ স্তরে ইলেকট্রন সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে বহিঃস্থ স্তরের ইলেকট্রনের ওপর নিউক্লিয়াসের ধনাত্মক চার্জের আকর্ষণ ক্রমশ বাড়ে এবং ইলেকট্রন মেঘ ভেতরের দিকে সংকুচিত হয়। এর ফলে পারমাণবিক ব্যাসার্ধ হ্রাস পায়। অতএব, পারমাণবিক আকারের সঠিক ক্রম: P (Na) > Q (Mg) > R (Al)।
২. পানির সাথে বিক্রিয়াশীলতার বিশ্লেষণ: ধাতুসমূহের রাসায়নিক সক্রিয়তা নির্ভর করে তাদের সর্ববহিঃস্থ স্তরের ইলেকট্রন সহজে বর্জন করে ধনাত্মক আয়নে পরিণত হওয়ার প্রবণতার ওপর। পরমাণুর আকার যত বড় হয়, আয়নিকরণ শক্তি তত কম হয় এবং ধাতব সক্রিয়তা তত বাড়ে।
- P (Na): গ্রুপ ১-এর ক্ষার ধাতু। এর পারমাণবিক আকার সবচেয়ে বড় হওয়ায় আয়নিকরণ শক্তি সবচেয়ে কম। ফলে এটি অতি দ্রুত ইলেকট্রন ত্যাগ করে এবং অত্যন্ত তীব্রভাবে স্বাভাবিক ঠান্ডা পানির সাথে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন গ্যাস ও তীব্র ক্ষার সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড উৎপন্ন করে (2Na + 2H₂O → 2NaOH + H₂)।
- Q (Mg): গ্রুপ ২-এর মৃৎক্ষার ধাতু। এর আকার Na অপেক্ষা ছোট এবং আয়নিকরণ শক্তি বেশি। তাই এটি ঠান্ডা পানির সাথে খুব ধীরগতিতে বিক্রিয়া করলেও ফুটন্ত পানি বা বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে (Mg + 2H₂O → Mg(OH)₂ + H₂)।
- R (Al): গ্রুপ ১৩-এর ধাতু। এর আকার ক্ষুদ্রতম এবং আয়নিকরণ শক্তি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি। সাধারণ তাপমাত্রায় অ্যালুমিনিয়ামের ওপর প্রতিরক্ষামূলক অক্সাইড স্তর থাকায় এটি স্বাভাবিক বা ফুটন্ত পানির সাথে সহজে বিক্রিয়া করে না, কেবলমাত্র উচ্চ তাপমাত্রায় লোহিত তপ্ত বাষ্পের সাথে ধীরগতিতে বিক্রিয়া করে।
সারসংক্ষেপ: পর্যায় সারণিতে ৩য় পর্যায় বরাবর বাম থেকে ডানে পারমাণবিক আকার ও পানির সাথে ধাতব বিক্রিয়াশীলতা উভয়ই ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পায়, অর্থাৎ ক্রমটি হলো: P > Q > R।