পর্যায় সারণির পরিবার: ক্ষারধাতু ও হ্যালোজেন
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
রসায়ন গবেষণাগারে সোডিয়ামকে (Na, পারমাণবিক সংখ্যা ১১) বাতাসের অক্সিজেন ও আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে কেরোসিনের নিচে রাখা হয়। এর ১ম আয়নীকরণ শক্তি ৪৯৬ kJ/mol। একই গ্রুপ-১ এর পরবর্তী ক্ষারধাতু পটাশিয়াম (K, পারমাণবিক সংখ্যা ১৯) পানির সংস্পর্শে এলে আরও তীব্র বিস্ফোরণসহ জ্বলে ওঠে। পটাশিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ১৯টি প্রোটন এবং বাইরে ৪টি শক্তিস্তরে ইলেকট্রন (২, ৮, ৮, ১) রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে বলো: সোডিয়াম নাকি পটাশিয়াম কার ১ম আয়নীকরণ শক্তি কম হবে?
সোডিয়াম (Na) নাকি পটাশিয়াম (K): কার ১ম আয়নীকরণ শক্তি কম?
- সোডিয়াম (Na) এর কম: পটাশিয়ামে বেশি প্রোটন থাকায় তা বহিঃস্থ ইলেকট্রনকে বেশি শক্তিতে ধরে রাখে
- উভয়ের মান সমান: একই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত সকল মৌলের বৈশিষ্ট্য হুবহু এক
- পটাশিয়াম (K) এর কম: নতুন শক্তিস্তর যুক্ত হওয়ায় বহিঃস্থ ইলেকট্রন নিউক্লিয়াস থেকে দূরে থাকে এবং সহজে অপসারিত হয়
যা বদলাতে পারবে
- ১ম মৌল (পারমাণবিক সংখ্যা Z): ১ থেকে ৩৬
- ২য় মৌল (পারমাণবিক সংখ্যা Z): ১ থেকে ৩৬
- পর্যায়বৃত্ত ধর্ম: আয়নীকরণ শক্তি, পারমাণবিক ব্যাসার্ধ, তড়িৎ ঋণাত্মকতা
যা মেপে দেখাবে
- ১ম মৌলের মান
- ২য় মৌলের মান
- ১ম মৌলের গ্রুপ
- ১ম মৌলের পর্যায়
- উভয় মৌল একই গ্রুপে?
চালানোর সময় খেয়াল করো
- ২য় মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ১৯ (পটাশিয়াম) করে দেখো। গ্রুপ-১ এ লিথিয়াম (৩) ও সোডিয়াম (১১) থেকে পটাশিয়ামে (১৯) যেতে আয়নীকরণ শক্তি বাড়ে নাকি কমে?
নিজে করে দেখো
- ১ম মৌলে আয়নীকরণ শক্তি বেছে নিয়ে পর্যায় সারণির ক্ষারধাতুগুলোর (গ্রুপ-১) মধ্যে সবচেয়ে কম আয়নীকরণ শক্তির ধাতুটিকে খুঁজে বের করো (মান ৪২০ kJ/mol এর কম)।
ইঙ্গিত
গ্রুপ-১ এর উপর থেকে নিচে নামলে পরমাণুর আকার বাড়ে এবং আয়নীকরণ শক্তি কমে। ৪র্থ পর্যায়ের ক্ষারধাতু পটাশিয়াম (১৯) পরীক্ষা করো।
- ১ম মৌলে তড়িৎ ঋণাত্মকতা বেছে নিয়ে হ্যালোজেন পরিবারের (গ্রুপ-১৭) মধ্যে সবচেয়ে বেশি তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলটি খুঁজে বের করো (মান ৩.৯ এর বেশি)।
ইঙ্গিত
গ্রুপ-১৭ হ্যালোজেন পরিবারের উপর থেকে নিচে তড়িৎ ঋণাত্মকতা কমে। ২য় পর্যায়ের হ্যালোজেন ফ্লোরিন (৯) পরীক্ষা করো।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
পর্যায় সারণির গ্রুপভিত্তিক ধর্ম ও পরিবার
একই গ্রুপের মৌলগুলোর সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে সমান সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে। যেমন: গ্রুপ-১ এর ক্ষারধাতুগুলোর (Li, Na, K) বাইরের স্তরে ১টি এবং গ্রুপ-১৭ এর হ্যালোজেনগুলোর (F, Cl, Br) বাইরের স্তরে ৭টি যোজ্যতা ইলেকট্রন থাকে। এজন্য একই গ্রুপের মৌলগুলো একই ধরনের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। তবে একই গ্রুপে উপর থেকে নিচে নামলে প্রতি ধাপে একটি করে নতুন প্রধান শক্তিস্তর যুক্ত হয়। এতে পরমাণুর আকার বৃদ্ধি পায় এবং নিউক্লিয়াস থেকে যোজ্যতা ইলেকট্রনের দূরত্ব বেড়ে যায়। ক্ষারধাতুগুলোর ক্ষেত্রে দূরবর্তী ১টি ইলেকট্রন ত্যাগ করে ধনাত্মক আয়ন (ক্যাটায়ন) তৈরি করা সহজ হয়, ফলে আয়নীকরণ শক্তি হ্রাস পায় এবং সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। তাই সোডিয়ামের চেয়ে পটাশিয়াম অনেক বেশি সক্রিয়। অন্যদিকে হ্যালোজেন পরিবারে মৌলগুলো ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক আয়ন (অ্যানায়ন) তৈরি করে। ফ্লোরিনের আকার সবচেয়ে ছোট হওয়ায় এর নিউক্লিয়াস আগত ইলেকট্রনকে সবচেয়ে প্রবলভাবে টানে। ফলে হ্যালোজেনগুলোর মধ্যে ফ্লোরিন সবচেয়ে তীব্র সক্রিয় এবং গ্রুপে নিচে নামলে সক্রিয়তা হ্রাস পায়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করেন পটাশিয়ামে বেশি প্রোটন (১৯টি) থাকায় তা বাইরের ইলেকট্রনকে বেশি শক্তিতে ধরে রাখবে, অথবা একই গ্রুপের সকল মৌলের ধর্ম হুবহু এক হবে। কিন্তু একই গ্রুপে নিচে নামলে শুধু প্রোটনই বাড়ে না, নতুন একটি করে শক্তিস্তরও যুক্ত হয়। পটাশিয়ামে ৪টি শক্তিস্তর থাকে, যেখানে সোডিয়ামে রয়েছে ৩টি। ভেতরের শক্তিস্তরের ইলেকট্রনগুলোর আবরণী প্রভাবের কারণে পটাশিয়ামের বহিঃস্থ ইলেকট্রনের ওপর নিট আকর্ষণ কমে যায়। ফলে সোডিয়ামের চেয়ে পটাশিয়ামের ১ম আয়নীকরণ শক্তি কম (৪১৯ kJ/mol < ৪৯৬ kJ/mol) এবং এটি সহজে ইলেকট্রন ত্যাগ করে বেশি তীব্র বিক্রিয়া ঘটায়।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- গ্রুপে নিচে নামলে প্রোটন সংখ্যা বাড়ে বলে পরমাণু বহিঃস্থ ইলেকট্রনকে বেশি শক্তিতে ধরে রাখে
- একই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত মৌলগুলোর সব ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম হুবহু এক থাকে
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- হাসপাতাল স্যালাইন ও ওআরএস প্রস্তুতি: ডায়রিয়া ও কলেরায় আক্রান্ত রোগীর পানিশূন্যতা রোধে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (icddr,b) উদ্ভাবিত ওআরএস (ORS) স্যালাইনে সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইড (KCl) সুনির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানো হয়। একই ক্ষারধাতু পরিবারের সদস্য হলেও পটাশিয়ামের আকার বড় হওয়ায় মানবকোষের ঝিল্লির সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্পে (Na⁺/K⁺ pump) কোষের ভেতরে K⁺ এবং বাইরে Na⁺ নিয়ন্ত্রিতভাবে কাজ করে, যা কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচায়।
- কৃষিতে মিউরেট অব পটাশ (MOP) সার ও ফসল উৎপাদন: বাংলাদেশের ধানের ফলন বাড়াতে ও খরা সহনশীলতা তৈরিতে ব্যাপক হারে পটাশিয়াম সমৃদ্ধ মিউরেট অব পটাশ (MOP) সার ব্যবহার করা হয়। ক্ষারধাতু পরিবারের পটাশিয়ামের আয়নীকরণ শক্তি কম হওয়ায় উদ্ভিদ মাটি থেকে সহজে K⁺ আয়ন শোষণ করে কোষের পানি ধারণক্ষমতা ও খাদ্য তৈরি বজায় রাখে। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম থাকলে তা পটাশিয়াম শোষণে বাধা দেয়, যা বুঝতে পর্যায়বৃত্ত ধর্মের জ্ঞান কাজে লাগে।