পর্যায়বৃত্ত ধর্ম ও পারমাণবিক আকার
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
আমাদের প্রতিদিনের রান্নার খাবার লবণের মূল উপাদান হলো সোডিয়াম (Na, পারমাণবিক সংখ্যা ১১) এবং ক্লোরিন (Cl, পারমাণবিক সংখ্যা ১৭)। পর্যায় সারণিতে উভয় মৌলই ৩য় পর্যায়ে (Period 3) অবস্থিত। একটি সোডিয়াম পরমাণুর আকার বা পারমাণবিক ব্যাসার্ধ ১৬৬ pm। ক্লোরিন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ১৭টি প্রোটন ও শক্তিস্তরে ১৭টি ইলেকট্রন রয়েছে — অর্থাৎ সোডিয়ামের চেয়ে ক্লোরিনে প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা বেশি। এই তথ্যের ভিত্তিতে বলো, সোডিয়াম ও ক্লোরিন পরমাণুর মধ্যে কোনটির আকার বড় হবে?
সোডিয়াম (Na, Z = ১১) নাকি ক্লোরিন (Cl, Z = ১৭) — কোনটির পরমাণুর আকার বড় হবে?
- ক্লোরিন (Cl) বড় — ১৭টি ইলেকট্রন ও প্রোটন থাকায় এটি বেশি স্থান দখল করে
- উভয়ের আকার সমান — উভয় মৌলেরই পরমাণুতে ৩টি করে শক্তিস্তর রয়েছে
- সোডিয়াম (Na) বড় — শক্তিস্তর না বাড়লেও ক্লোরিনের অতিরিক্ত প্রোটন ইলেকট্রন মেঘকে তীব্রভাবে টেনে ছোট করে ফেলে
যা বদলাতে পারবে
- ১ম মৌল (পারমাণবিক সংখ্যা Z): ১ থেকে ৩৬
- ২য় মৌল (পারমাণবিক সংখ্যা Z): ১ থেকে ৩৬
- পর্যায়বৃত্ত ধর্ম: পারমাণবিক ব্যাসার্ধ, আয়নীকরণ শক্তি, তড়িৎ ঋণাত্মকতা
যা মেপে দেখাবে
- ১ম মৌলের মান
- ২য় মৌলের মান
- বৃহত্তর মানের মৌল (Z)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- ২য় মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ১৭ (ক্লোরিন) করে দেখো। ৩য় পর্যায়ে সোডিয়াম (১১) থেকে ক্লোরিনে (১৭) যেতে পারমাণবিক ব্যাসার্ধ বাড়ে নাকি কমে?
নিজে করে দেখো
- তড়িৎ ঋণাত্মকতা বেছে নাও এবং সবচেয়ে বেশি তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলটি খুঁজে বের করো (মান ৩.৯-এর বেশি)।
ইঙ্গিত
পর্যায়ে ডানে গেলে তড়িৎ ঋণাত্মকতা বাড়ে, গ্রুপে নিচে নামলে কমে।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
পর্যায়বৃত্ত ধর্ম: পর্যায় ও গ্রুপভিত্তিক পরিবর্তন
একই পর্যায়ের বাম থেকে ডানে গেলে পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু নতুন কোনো প্রধান শক্তিস্তর যুক্ত হয় না। ফলে বাইরের স্তরের ইলেকট্রনগুলোর ওপর নিউক্লিয়াসের নিট আকর্ষণ (কার্যকর নিউক্লীয় চার্জ Z_eff) বৃদ্ধি পায় এবং ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের কাছে সংকুচিত হয়। তাই একই পর্যায়ে বাম থেকে ডানে পারমাণবিক ব্যাসার্ধ হ্রাস পায় (সোডিয়াম ১৬৬ pm > ক্লোরিন ১০২ pm)। আকার ছোট হওয়ায় বাইরের ইলেকট্রন ত্যাগ করতে বেশি শক্তি লাগে, ফলে আয়নীকরণ শক্তি বৃদ্ধি পায়। বিপরীতভাবে, একই গ্রুপের উপর থেকে নিচে নামলে নতুন শক্তিস্তর যুক্ত হওয়ায় পরমাণুর আকার বাড়ে এবং আয়নীকরণ শক্তি কমে।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকের ভুল ধারণা হয় যে প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা বেশি হলে পরমাণুর আকারও বড় হবে। কিন্তু সোডিয়াম ও ক্লোরিন উভয়েরই ইলেকট্রন ৩টি শক্তিস্তরে বিন্যস্ত। ক্লোরিনের নিউক্লিয়াসে ১৭টি প্রোটন থাকায় তা বহিঃস্থ ইলেকট্রনগুলোকে সোডিয়ামের (১১টি প্রোটন) চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালীভাবে ভেতরের দিকে টানে। ফলে ক্লোরিনের বাইরের শক্তিস্তর সংকুচিত হয়ে সোডিয়ামের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট (১০২ pm) হয়ে যায়।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- পরমাণুতে প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা বেশি হলে পরমাণুর আকার সর্বদা বড় হয়
- পরমাণুর শক্তিস্তর সংখ্যা সমান হলে তাদের আকারও সমান হয়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ — সাতক্ষীরা ও খুলনাসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ ও নদীর পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) থাকে। রিভার্স অসমোসিস (RO) ও মেমব্রেন ফিল্ট্রেশনে সোডিয়াম (Na⁺) ও ক্লোরাইড (Cl⁻) আয়নের আকার ও হাইড্রেশন ব্যাসার্ধের পর্যায়বৃত্ত ধর্ম বিবেচনা করে উপযুক্ত ছাঁকনি নকশা করা হয়, যা লাখ লাখ মানুষের সুপেয় পানির নিরাপত্তা দেয়।
- কৃষিজমিতে সার প্রয়োগ ও লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা — বাংলাদেশের কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত পটাশ সারের পটাশিয়াম (K) একই গ্রুপভুক্ত হওয়ায় সোডিয়ামের (Na) চেয়ে আকারে বড় এবং এর আয়নীকরণ শক্তি কম। এই পর্যায়বৃত্ত পার্থক্যের কারণে উদ্ভিদের মূল দ্রুত K⁺ গ্রহণ করতে পারে; অন্যদিকে মাটির ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা (CEC) নিয়ন্ত্রণে ক্ষারধাতুসমূহের আকারের তারতম্য হিসাব করে উপকূলীয় মাটির লবণাক্ততা হ্রাস করা হয়।