কুমিল্লার একটি বিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে শিক্ষক নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পেঁয়াজের মূলের অগ্রভাগের স্লাইড ও চার্টের সাহায্যে কোষ বিভাজনের বিভিন্ন পর্যায় দেখাচ্ছিলেন। তিনি একটি পর্যায়ে দেখালেন যে ক্রোমোজোমগুলো স্পিন্ডল যন্ত্রের বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে এবং এগুলো সবচেয়ে খাটো ও মোটা। অপর একটি পর্যায়ে সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়ে অপত্য ক্রোমোজোমগুলো বিপরীত মেরুর দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ক্রোমোজোমগুলোকে V, L, J ও I অক্ষরের মতো দেখাচ্ছে। শিক্ষক বললেন, এই কোষ বিভাজনটি জীবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ক্ষত নিরাময়ের জন্য অপরিহার্য, তবে জীবের জননকোষ উৎপাদনে ভিন্ন এক ধরনের কোষ বিভাজন ঘটে যা বংশপরম্পরায় প্রজাতির স্বকীয়তা ও ক্রোমোজোম সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করে।
- ক
কোষ বিভাজন (Cell division) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
যে জৈবিক প্রক্রিয়ায় একটি মাতৃকোষ বিভাজিত হয়ে দুই বা ততোধিক নতুন অপত্য কোষ সৃষ্টি করে, তাকে কোষ বিভাজন বলে।
- খ
অ্যামাইটোটিক কোষ বিভাজনকে প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
অ্যামাইটোটিক কোষ বিভাজনে স্পিন্ডল যন্ত্র সৃষ্টি বা ক্রোমোজোমের জটিল কোনো মাধ্যমিক পরিবর্তন ঘটে না। এ প্রক্রিয়ায় মাতৃকোষের নিউক্লিয়াসটি সরাসরি ডাম্বেল আকার ধারণ করে মাঝখানে খাঁজ সৃষ্টির মাধ্যমে দুই ভাগে বিভক্ত হয় এবং একই সাথে সাইটোপ্লাজমও মাঝখান বরাবর সংকুচিত হয়ে সরাসরি দুটি অপত্য কোষ গঠন করে; কোনো জটিল মধ্যবর্তী পর্যায় ছাড়া সরাসরি সংঘটিত হয় বলেই একে প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন বলা হয়।
- গ
উদ্দীপকে বর্ণিত দ্বিতীয় পর্যায়টিতে ক্রোমোজোমের যে বিভিন্ন রূপ দেখা যায়, তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকে বর্ণিত দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো মাইটোসিসের অ্যানাফেজ (Anaphase) বা গতিপর্যায়। এ পর্যায়ে সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়ে প্রতিটি ক্রোমাটিড অপত্য ক্রোমোজোমে পরিণত হয় এবং এরা বিপরীত মেরুর দিকে চলতে শুরু করে। মেরুমুখী চলনের সময় সেন্ট্রোমিয়ার অগ্রগামী থাকে এবং বাহুদ্বয় অনুগামী হয়। সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ক্রোমোজোমগুলোকে চারটি নির্দিষ্ট ইংরেজি অক্ষরের মতো দেখায়: ১. মেটাসেন্ট্রিক (Metacentric): সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোজোমের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করলে এর দুই বাহু সমান দৈর্ঘ্যের হয় এবং মেরুমুখী চলনে এটি ইংরেজি 'V' অক্ষরের রূপ নেয়। ২. সাব-মেটাসেন্ট্রিক (Sub-metacentric): সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোজোমের মাঝখানের কাছাকাছি অবস্থান করলে এক বাহু অপর বাহুর চেয়ে সামান্য দীর্ঘ হয় এবং এটি ইংরেজি 'L' অক্ষরের মতো দেখায়। ৩. অ্যাক্রোসেন্ট্রিক (Acrocentric): সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোজোমের এক প্রান্তের কাছাকাছি অবস্থান করলে একটি বাহু অনেক দীর্ঘ এবং অপরটি অতি ক্ষুদ্র হয়, ফলে এটি ইংরেজি 'J' অক্ষরের রূপ ধারণ করে। ৪. টেলোসেন্ট্রিক (Telocentric): সেন্ট্রোমিয়ার ক্রোমোজোমের একেবারে প্রান্তে অবস্থিত হলে এতে কার্যকরভাবে একটি বাহু দৃশ্যমান থাকে এবং এটি ইংরেজি 'I' অক্ষরের মতো দেখায়।
- ঘ
শিক্ষকের শেষ বক্তব্যটির যথার্থতা বিশ্লেষণ করো—জীবদেহের বৃদ্ধি ও প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষায় মাইটোসিস ও মিয়োসিস উভয়ের ভূমিকা কীভাবে পরস্পর পরিপূরক?
উত্তর দেখাও
শিক্ষকের বক্তব্যটি অত্যন্ত যথার্থ। জীবজগতের ধারাবাহিকতা ও অস্তিত্ব রক্ষায় মাইটোসিস এবং মিয়োসিস উভয় কোষ বিভাজনই অপরিহার্য ও পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা পালন করে: ১. দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশ: যৌন প্রজননশীল সব বহুকোষী জীবের সূচনা ঘটে একটিমাত্র কোষ—নিষিক্ত ডিম্বাণু বা জাইগোট (2n) থেকে। এই একক কোষটিতে বারবার মাইটোসিস বিভাজন সংঘটিত হয়ে লক্ষ-কোটি সমবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোষ সৃষ্টি হয়, যার মাধ্যমে ভ্রূণের ক্রমবিকাশ ও পূর্ণাঙ্গ দেহ গঠিত হয়। ২. ক্ষয়পূরণ ও টিস্যু পুনর্গঠন: জীবের দৈনন্দিন জীবনে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের ক্ষত নিরাময়, ত্বক বা অন্ত্রের মতো ক্ষয়িষ্ণু টিস্যুর পুরাতন কোষ প্রতিস্থাপন কেবল মাইটোসিসের মাধ্যমেই সমগুণসম্পন্ন কোষ সৃষ্টির দ্বারা সম্ভব হয়। ৩. ক্রোমোজোম সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা: যদি জননকোষ তৈরিতে মিয়োসিস না ঘটে মাইটোসিস ঘটত, তবে শুক্রাণু (2n) ও ডিম্বাণুর (2n) মিলনে জাইগোটে ক্রোমোজোম সংখ্যা দ্বিগুণ (4n) হয়ে যেত এবং পরবর্তী প্রজন্মে তা আরও বৃদ্ধি পেত। মিয়োসিস বিভাজনে ক্রোমোজোম সংখ্যা মাতৃকোষের অর্ধেক (n) হয়ে যায় বলে নিষেকের পর জাইগোটে পুনরায় মাতৃপ্রজাতির সমান নির্দিষ্ট ক্রোমোজোম সংখ্যা (2n) পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়। ৪. বংশগতীয় বৈচিত্র্য ও অভিযোজন: মিয়োসিস বিভাজনে হোমোলোগাস ক্রোমোজোমের মধ্যে ক্রসিং ওভার ও স্বাধীন বিন্যাসের ফলে জিনগত পুনর্বিন্যাস ঘটে। এতে অপত্য বংশধরে নতুন বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ও বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়, যা পরিবর্তিত পরিবেশে প্রজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং জৈব বিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। সুতরাং, মাইটোসিস জীবদেহের বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ নিশ্চিত করে দেহকে কার্যকর রাখে এবং মিয়োসিস প্রজাতির স্বকীয়তা বজায় রেখে জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।