চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি ধাতু নিষ্কাশন ও ভারী রাসায়নিক কারখানায় শিক্ষার্থীরা তিনটি ভিন্ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করল: ১ম পাত্র: জিংক ব্লেন্ড (ZnS) আকরিককে অতিরিক্ত বায়ুর উপস্থিতিতে গলনাঙ্কের চেয়ে কম তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে ধাতব অক্সাইড ও একটি ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত গ্যাস (A) তৈরি করা হলো। ২য় পাত্র: কপার সালফেটের (CuSO₄) নীল জলীয় দ্রবণে একটি পরিষ্কার লোহার (Fe) পেরেক ডুবিয়ে রাখা হলো। ৩য় পাত্র: অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের (Al₂O₃) সাথে ক্রায়োলাইট (Na₃AlF₆) মিশিয়ে গলিত মিশ্রণকে তড়িৎ বিশ্লেষণ করে ক্যাথোডে বিশুদ্ধ ধাতু নিষ্কাশন করা হলো। (দেওয়া আছে: ধাতুর সক্রিয়তা ক্রম: Al > Zn > Fe > Cu)।
- ক
আকরিক (ore) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
যেসব খনিজ থেকে সহজে ও লাভজনক উপায়ে ধাতু বা অধাতু নিষ্কাশন করা যায়, তাদেরকে আকরিক বলে।
- খ
“সকল আকরিকই খনিজ, কিন্তু সকল খনিজ আকরিক নয়”—উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
প্রকৃতিতে মাটির উপরে বা নিচে প্রাপ্ত যেসব যৌগ থেকে ধাতু বা অধাতু পাওয়া যায়, তাদের সবই খনিজ। কিন্তু শুধুমাত্র যেসব খনিজ থেকে সহজে ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উপায়ে ধাতু নিষ্কাশন করা সম্ভব, কেবল তাদেরকেই আকরিক বলা হয়। যেমন—বক্সাইট (Al₂O₃·2H₂O) এবং কাদামাটি (Al₂O₃·2SiO₂·2H₂O) উভয়ই অ্যালুমিনিয়ামের খনিজ; তবে কাদামাটি থেকে সহজে ও লাভজনকভাবে অ্যালুমিনিয়াম আহরণ করা যায় না বলে এটি কেবল খনিজ, আকরিক নয়। অন্যদিকে বক্সাইট থেকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উপায়ে অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশন করা যায় বলে এটি একই সাথে খনিজ ও আকরিক। তাই বলা হয়, সকল আকরিকই খনিজ, কিন্তু সকল খনিজ আকরিক নয়।
- গ
উদ্দীপকের ১ম পাত্রের প্রক্রিয়াটির নাম কী? এতে উৎপন্ন গ্যাস A পরিবেশের ওপর কীভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তা সমীকরণসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের ১ম পাত্রে সংঘটিত প্রক্রিয়াটির নাম হলো 'তাপজারণ' (roasting)। সালফাইড আকরিক জিংক ব্লেন্ডকে (ZnS) অতিরিক্ত বাতাসের অক্সিজেনের উপস্থিতিতে গলনাঙ্কের চেয়ে কম তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করায় জিংক অক্সাইড এবং ঝাঁঝালো গ্যাস হিসেবে সালফার ডাই-অক্সাইড (SO₂) উৎপন্ন হয়: 2ZnS(s) + 3O₂(g) → 2ZnO(s) + 2SO₂(g)। এখানে উৎপন্ন গ্যাস A হলো সালফার ডাই-অক্সাইড (SO₂)।
পরিবেশের ওপর প্রভাব (অম্লবৃষ্টি): ১. SO₂ গ্যাস বাতাসে নির্গত হয়ে মেঘের বৃষ্টির পানির সাথে বিক্রিয়া করে ক্ষতিকর সালফিউরাস অ্যাসিড (H₂SO₃) তৈরি করে: SO₂(g) + H₂O(l) → H₂SO₃(aq)। ২. এছাড়াও বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে SO₂ জারিত হয়ে SO₃ গ্যাস উৎপন্ন করে, যা বৃষ্টির পানির সাথে মিশে শক্তিশালী সালফিউরিক অ্যাসিড (H₂SO₄) উৎপন্ন করে: 2SO₂(g) + O₂(g) → 2SO₃(g) SO₃(g) + H₂O(l) → H₂SO₄(aq)। বৃষ্টির পানির সাথে এই অ্যাসিডগুলো মিশে অম্লবৃষ্টি (acid rain) সৃষ্টি করে, যা নদী ও জলাশয়ের পানির pH কমিয়ে জলজ প্রাণী ও মাছ ধ্বংস করে, মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং গাছপালা ও ঐতিহাসিক দালানকোঠার মারাত্মক ক্ষয়সাধন করে।
- ঘ
২য় পাত্রে কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটবে কি না সক্রিয়তা সিরিজের আলোকে ব্যাখ্যা করো এবং ৩য় পাত্রের অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশনে কার্বন বিজারণের বদলে তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
২য় পাত্রের রাসায়নিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ: ধাতুর সক্রিয়তা সিরিজে কপারের (Cu) চেয়ে লোহার (Fe) অবস্থান উপরে হওয়ায় আয়রন কপার অপেক্ষা অধিক সক্রিয় ধাতু। সক্রিয়তা সিরিজের নিয়ম অনুসারে, অধিক সক্রিয় ধাতু তার চেয়ে কম সক্রিয় ধাতুর লবণের দ্রবণ থেকে কম সক্রিয় ধাতুকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে। সুতরাং, ২য় পাত্রে লোহার পেরেক কপার সালফেট দ্রবণ থেকে Cu²⁺ আয়নকে প্রতিস্থাপিত করে কপার ধাতু মুক্ত করবে এবং নিজে দ্রবীভূত হয়ে ফেরাস সালফেট (FeSO₄) তৈরি করবে: Fe(s) + CuSO₄(aq) → FeSO₄(aq) + Cu(s)। এর ফলে কপার সালফেট দ্রবণের নীল বর্ণ ধীরে ধীরে হালকা সবুজ বর্ণে রূপান্তরিত হবে এবং পেরেকের গায়ে লালচে বাদামি তামার প্রলেপ পড়বে।
৩য় পাত্রে তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতির যৌক্তিকতা: অ্যালুমিনিয়াম সক্রিয়তা সিরিজের শীর্ষভাগের একটি অত্যন্ত তীব্র সক্রিয় ধাতু। অক্সিজেনের প্রতি অ্যালুমিনিয়ামের রাসায়নিক আসক্তি কার্বনের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে উচ্চ তাপমাত্রাতেও কার্বন অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড (Al₂O₃) থেকে অক্সিজেনকে অপসারণ করে অ্যালুমিনিয়ামকে বিজারিত করতে পারে না, অর্থাৎ কার্বন বিজারণ পদ্ধতি এখানে সম্পূর্ণ অকার্যকর। পক্ষান্তরে, গলিত Al₂O₃-এর মধ্যে ক্রায়োলাইট (Na₃AlF₆) মিশিয়ে গলনাঙ্ক হ্রাস করে তড়িৎ বিশ্লেষণ ঘটালে ক্যাথোড ও অ্যানোডে নিম্নলিখিত বিক্রিয়া ঘটে: ক্যাথোড বিক্রিয়া (বিজারণ): 2Al³⁺ + 6e⁻ → 2Al(l) অ্যানোড বিক্রিয়া (জারণ): 3O²⁻ → 1.5O₂(g) + 6e⁻ (বা 2O²⁻ → O₂ + 4e⁻)। এতে ক্যাথোডে বিশুদ্ধ তরল অ্যালুমিনিয়াম ধাতু জমা হয়। অতএব, Al₂O₃ থেকে অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশনে কার্বন বিজারণের পরিবর্তে তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতি বেছে নেওয়া সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত ও অপরিহার্য।