ধাতু নিষ্কাশন: অ্যালুমিনিয়াম বনাম আয়রন
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
বাংলাদেশের রড ও ইস্পাত কারখানাগুলোতে আকরিক লোহাকে কয়লা বা কার্বনের (কোক) সাথে চুল্লিতে উত্তপ্ত করে আয়রন নিষ্কাশন করা হয়। কিন্তু আমাদের রান্নাবান্নার হাঁড়ি-পাতিল ও কড়াই তৈরিতে ব্যাপকভাবে হালকা অ্যালুমিনিয়াম ধাতু ব্যবহার করা হয়। ধাতুর সক্রিয়তা সিরিজে অ্যালুমিনিয়ামের অবস্থান জিংক ও লোহার উপরে। বক্সাইট আকরিক থেকে ধাতব অ্যালুমিনিয়াম কীভাবে নিষ্কাশন করা হয়?
অ্যালুমিনিয়াম আকরিক (বক্সাইট) থেকে ধাতু নিষ্কাশনে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়?
- তড়িৎ বিশ্লেষণ: গলিত আকরিকের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চালনা করে
- কার্বন বিজারণ: কয়লা বা কোক কার্বনের সাথে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে
- প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থা: মাটির নিচ থেকে সরাসরি বিশুদ্ধ ধাতব অ্যালুমিনিয়াম আহরণ করে
যা বদলাতে পারবে
- ধাতু: পটাসিয়াম (K), সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), অ্যালুমিনিয়াম (Al), জিংক (Zn), আয়রন / লোহা (Fe), লেড / সীসা (Pb), কপার / তামা (Cu), সিলভার / রূপা (Ag), গোল্ড / সোনা (Au)
- দ্রবণ: কপার সালফেট (CuSO₄), ফেরাস সালফেট (FeSO₄), হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl)
যা মেপে দেখাবে
- নিষ্কাশন পদ্ধতি
- প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া ঘটে?
- সক্রিয়তার ব্যবধান
চালানোর সময় খেয়াল করো
- ধাতু পরিবর্তন করে অ্যালুমিনিয়াম (Al) নির্বাচন করো। নিষ্কাশন পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন আসছে তা লক্ষ করো।
- সক্রিয়তা সিরিজে জিংকের উপরের ধাতুগুলোর নিষ্কাশন পদ্ধতি এবং জিংক থেকে লেড পর্যন্ত ধাতুগুলোর পদ্ধতি তুলনা করো।
নিজে করে দেখো
- এমন একটি ধাতু খুঁজে বের করো যা কার্বন বিজারণ পদ্ধতিতে নিষ্কাশন করা হয়, কিন্তু তা কপার সালফেট (CuSO₄) দ্রবণ থেকে কপারকে প্রতিস্থাপন করতে পারে।
ইঙ্গিত
দ্রবণ হিসেবে কপার সালফেট (CuSO₄) নির্বাচন করো। সক্রিয়তা সিরিজে কপারের উপরে থাকা মধ্যম সক্রিয় ধাতুগুলো পরখ করে দেখো।
- প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এমন একটি ধাতু নির্বাচন করো যা হাইড্রোক্লোরিক এসিডের (HCl) সাথে কোনো প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া দেয় না।
ইঙ্গিত
দ্রবণ হিসেবে HCl নাও। সক্রিয়তা সিরিজের একেবারে নিচে থাকা নিষ্ক্রিয় ধাতুগুলো পরখ করে দেখো।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
ধাতুর সক্রিয়তা সিরিজ ও নিষ্কাশন পদ্ধতি
ধাতুর সক্রিয়তা সিরিজে ধাতুর অবস্থান থেকেই নির্ধারিত হয় তার আকরিক থেকে ধাতু কীভাবে নিষ্কাশন করা হবে। যে ধাতু যত বেশি সক্রিয়, অক্সিজেনের প্রতি তার আকর্ষণ তত তীব্র এবং তার অক্সাইড তত বেশি সুস্থিত। সক্রিয়তা সিরিজে জিংকের উপরে থাকা তীব্র সক্রিয় ধাতুসমূহ (K, Na, Ca, Mg, Al) তাদের অক্সাইড থেকে কার্বন দ্বারা মুক্ত হতে পারে না, কারণ কার্বনের চেয়ে এদের অক্সিজেনের প্রতি তীব্র টান বেশি। তাই এদের গলিত যৌগ থেকে শক্তিশালী তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিষ্কাশন করা হয়। মধ্যম সক্রিয় ধাতুসমূহ (Zn থেকে Pb এবং Cu) কয়লা বা কোক কার্বনের সাহায্যে উচ্চ তাপমাত্রায় বিজারিত করে সহজে নিষ্কাশন করা যায়। আর রূপা ও সোনা খুব কম সক্রিয় হওয়ায় প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় অথবা সামান্য উত্তাপেই মুক্ত হয়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
কার্বন সব ধাতুর অক্সাইড থেকে অক্সিজেন আলাদা করতে পারে না। কার্বন কেবল সেইসব ধাতুর অক্সাইড বিজারিত করতে পারে যা কার্বনের চেয়ে কম শক্তিতে অক্সিজেনকে ধরে রাখে। কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম অত্যন্ত সক্রিয় ধাতু হওয়ায় এটি অক্সিজেনের সাথে অত্যন্ত শক্তিশালী বন্ধন গঠন করে, যা কার্বন ভাঙতে পারে না। আবার অ্যালুমিনিয়াম এত সক্রিয় যে এটি প্রকৃতিতে কখনো সোনা বা রূপার মতো মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় না; মাটিতে এটি বক্সাইট যৌগের রূপেই থাকে। তাই অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশনে তড়িৎ বিশ্লেষণই একমাত্র কার্যকর উপায়।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- কয়লা বা কোক কার্বন দিয়ে উত্তপ্ত করলেই যেকোনো ধাতুর অক্সাইড থেকে অক্সিজেন আলাদা করা যায়
- অ্যালুমিনিয়াম প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ মুক্ত ধাতু হিসেবে মাটির নিচে পাওয়া যায়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- রান্নার হাঁড়ি-পাতিল ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্প: বাংলাদেশের গৃহস্থালির রান্নার ডেকচি, কড়াই ও অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল তৈরিতে হালকা ও ক্ষয়রোধী অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহৃত হয়। বক্সাইট থেকে তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে উৎপাদিত এই ধাতু অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী এবং পুরান ঢাকা ও বগুড়ার মেটাল ওয়ার্কশপে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম গলিয়ে সহজে পুনঃব্যবহার করা হয়।
- ইস্পাত ও রড নির্মাণ শিল্প: চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের বৃহৎ স্টিল মিলগুলোতে আকরিক লোহাকে কয়লা বা কার্বনের সাহায্যে বিজারিত করে রড, বার ও অ্যাঙ্গেল তৈরি করা হয়। সক্রিয়তা সিরিজে মধ্যম অবস্থানে থাকায় কম খরচে কার্বন বিজারণ পদ্ধতিতে লোহা নিষ্কাশন সম্ভব হয়, যা দেশের মেগা প্রকল্প ও ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত হয়।