দিনাজপুরের কৃষক রফিকুল ইসলাম প্রতি বছর বাজার থেকে সাধারণ বীজ আলু কিনে রোপণ করতেন, কিন্তু ভাইরাস ও ছত্রাকের সংক্রমণে গাছ মরে গিয়ে তাঁর ফলন ব্যাপকভাবে কমে যেত। এই সংকট কাটাতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর বিজ্ঞানীরা একটি সুস্থ আলুর কান্ডের শীর্ষ মুকুল (shoot tip) সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম পুষ্টি মাধ্যমে অণুবিস্তারণ (micropropagation) প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত ও উচ্চফলনশীল অণুচারা উৎপাদন করে তাঁকে সরবরাহ করেন। রফিকুল ইসলাম এই চারা চাষ করে ভাইরাসমুক্ত বাম্পার ফলন লাভ করেন। অন্যদিকে, নাটোরের কৃষক শফিক মিয়া তাঁর বেগুন ক্ষেতে ক্ষতিকর ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার তীব্র আক্রমণে দিশেহারা হয়ে বিপুল পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করছিলেন, যার ফলে তাঁর উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায় এবং তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন। পরবর্তীতে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে তিনি Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়ার ক্রাই (Cry) জিন স্থানান্তরের মাধ্যমে তৈরি বিশেষ জাতের 'বিটি বেগুন' চাষ শুরু করেন এবং কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই পোকার আক্রমণমুক্ত লাভজনক ফলন পান।
- ক
এক্সপ্লান্ট (Explant) কী?
উত্তর দেখাও
টিস্যু কালচার প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য মাতৃ উদ্ভিদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া যে কোনো সজীব ও বিভাজনক্ষম অঙ্গ বা টিস্যুর অংশকে (যেমন শীর্ষ মুকুল বা কচি পাতা) এক্সপ্লান্ট বলে।
- খ
টিস্যু কালচারের পুষ্টি মাধ্যমে অ্যাগার (agar) এবং সুক্রোজ (sucrose) কেন ব্যবহার করা হয়— ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
টিস্যু কালচার মাধ্যমে সুক্রোজ (সাধারণত ২-৪%) ব্যবহৃত হয় কারণ বিচ্ছিন্ন এক্সপ্লান্টের কোষগুলো প্রাথমিক অবস্থায় সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে না, ফলে কোষ বিভাজন ও বিপাকীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুক্রোজ অপরিহার্য কার্বন ও শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, সামুদ্রিক শৈবাল থেকে সংগৃহীত অ্যাগার (০.৮-১.০%) তরল পুষ্টি মাধ্যমকে জমাট বাঁধিয়ে আধা-কঠিন (semi-solid) জেলিতে পরিণত করে, যার ফলে এক্সপ্লান্টটি মাধ্যমের ওপর স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থেকে সহজে পুষ্টি উপাদান ও অক্সিজেন শোষণ করতে পারে।
- গ
রফিকুল ইসলামের ক্ষেত্রে অনুসৃত প্রযুক্তিটির (টিস্যু কালচার) প্রধান ধাপসমূহ পর্যায়ক্রমিক প্রবাহচিত্রসহ (flowchart) বর্ণনা করো।
উত্তর দেখাও
রফিকুল ইসলামের রোগমুক্ত বীজ আলু উৎপাদনে 'উদ্ভিদ টিস্যু কালচার' (মেরিস্টেম কালচার) প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
পদ্ধতিটির প্রধান পর্যায়ক্রমিক ধাপসমূহ নিচে বর্ণনা করা হলো: ১. মাতৃ উদ্ভিদ নির্বাচন ও এক্সপ্লান্ট পৃথকীকরণ: সুস্থ, নিরোগ ও উচ্চফলনশীল আলু গাছের অগ্রভাগের শীর্ষ মুকুল বা ভাজক টিস্যু (meristem) কেটে সংগ্রহ করা হয়। ২. পুষ্টি মাধ্যম (Culture medium) তৈরি: উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাক্রো ও মাইক্রো পুষ্টি উপাদান, ভিটামিন, সুক্রোজ, ফাইটোহরমোন (অক্সিন ও সাইটোকাইনিন) এবং অ্যাগার মিশিয়ে উপযুক্ত pH (৫.৫-৫.৮) মাত্রায় পুষ্টি দ্রবণ প্রস্তুত করা হয়। ৩. অটোক্লেভ যন্ত্রে নির্বীজকরণ: সংক্রামক জীবাণু ধ্বংস করতে পুষ্টি মাধ্যম ও কাচপাত্রকে অটোক্লেভ যন্ত্রে ১২১ °C তাপমাত্রায় এবং ১৫ lb/in² চাপে ২০ মিনিট রেখে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়। ৪. পুষ্টি মাধ্যমে এক্সপ্লান্ট স্থাপন (Inoculation): ল্যামিনার এয়ারফ্লো ক্যাবিনেটের জীবাণুমুক্ত পরিবেশে এক্সপ্লান্টটি মিডিয়ামযুক্ত টেস্টটিউব বা ফ্লাস্কে স্থাপন করা হয়। ৫. ক্যালাস ও অণুচারা সৃষ্টি: নিয়ন্ত্রিত আলো ও তাপমাত্রায় (২৫ ± ২ °C) এক্সপ্লান্টের কোষগুলো মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে প্রথমে অবয়বহীন কোষপিণ্ড 'ক্যালাস' (callus) এবং পরবর্তীতে অসংখ্য ক্ষুদ্র বিটপ বা মুকুল তৈরি করে। ৬. মূল উৎপাদন ও মাঠপর্যায়ে অভিযোজন: বিটপগুলো কেটে অক্সিনসমৃদ্ধ মূল উৎপাদনকারী মাধ্যমে স্থাপন করে পূর্ণাঙ্গ অণুচারা তৈরি করা হয়। এরপর ল্যাবরেটরি থেকে বের করে টবের মাটিতে রেখে প্রাকৃতিক পরিবেশে খাপ খাইয়ে (acclimatization বা hardening) সরাসরি কৃষক রফিকুল ইসলামের মাঠে রোপণ করা হয়।
প্রবাহচিত্র: মাতৃ উদ্ভিদ নির্বাচন এক্সপ্লান্ট সংগ্রহ পুষ্টি মাধ্যম তৈরি ও অটোক্লেভে জীবাণুমুক্তকরণ মাধ্যমে স্থাপন ক্যালাস ও বিটপ সৃষ্টি মূল উৎপাদন টবে অভিযোজন মাঠপর্যায়ে রোপণ।
- ঘ
"শফিক মিয়ার জমিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তিটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে"— উদ্দীপকের আলোকে উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখাও
উক্তিটি সম্পূর্ণ যথার্থ এবং বিজ্ঞানসম্মত। শফিক মিয়ার ক্ষেত্রে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত ট্রান্সজেনিক শস্য 'বিটি বেগুন' (Bt brinjal) চাষ করা হয়েছে।
যৌক্তিক মূল্যায়ন ও বহুমুখী প্রভাব বিশ্লেষণ: ১. কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা: বাংলাদেশে প্রচলিত জাতের বেগুন চাষে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকদের এক মৌসুমে ৮০ থেকে ১০০ বারের বেশি কীটনাশক স্প্রে করতে হতো। এতে ফসলের উৎপাদন খরচের প্রায় ৩৫-৪০% ব্যয় হতো কেবল কীটনাশক ক্রয়ে। বিটি বেগুনে থাকা Cry প্রোটিন পোকার বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলায় কীটনাশকের খরচ সাশ্রয় হয় এবং পোকার ক্ষতি না থাকায় হেক্টরপ্রতি ফলন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা প্রান্তিক কৃষকের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করছে। ২. কৃষক ও ভোক্তার জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা: কৃষকরা খোলা মুখে কোনো সুরক্ষা ছাড়াই ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করার কারণে চর্মরোগ, চোখের প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট এবং স্নায়বিক বৈকল্যে ভুগতেন, যেমনটি শফিক মিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছে। তাছাড়া বিষাক্ত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশযুক্ত বেগুন খেয়ে সাধারণ ভোক্তারা ক্যান্সার ও কিডনি রোগের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তেন। বিটি বেগুন চাষে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন না থাকায় কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুলাংশে দূর হয়। ৩. পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী অণুজীব ও পরাগায়নকারী বন্ধু পোকা (যেমন মৌমাছি) বিনষ্ট হতো এবং বৃষ্টির পানিতে কীটনাশক ধুয়ে খাল-বিল ও পদ্মার মতো উন্মুক্ত জলাশয়ে গিয়ে মাছ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করত। বিটি বেগুনের ক্রাই টক্সিন শুধুমাত্র ক্ষতিকর পোকার ক্ষারীয় অন্ত্রে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং মানুষ, গবাদি পশু বা অন্যান্য উপকারী কীটপতঙ্গের কোনো ক্ষতি করে না। ফলে এটি মাটির উর্বরতা রক্ষা করে এবং পরিবেশ দূষণ রোধ করে।
অতএব, বিটি বেগুন চাষ কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে জাতীয় কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই কৃষিব্যবস্থা গঠনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।