offSchoolবেটা

জীববিজ্ঞান · অধ্যায় ১৪

ব্যাকটেরিয়া থেকে মানব ইনসুলিন উৎপাদন: রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি

মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।

বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ঢাকার বারডেম (BIRDEM) হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, বহু রোগীর রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন নির্দিষ্ট মাত্রায় ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়। ইনসুলিন মূলত ৫১টি অ্যামাইনো অ্যাসিড নিয়ে গঠিত একটি প্রোটিন হরমোন, যার A শৃঙ্খলে ২১টি এবং B শৃঙ্খলে ৩০টি অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে। অতীতে গরু বা শূকরের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন সংগ্রহ করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তা মানুষের শরীরে মারাত্মক অ্যালার্জি সৃষ্টি করত। বর্তমানে জীবপ্রযুক্তির রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ (rDNA) কৌশলে নিরীহ ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে কারখানায় ১০০% খাঁটি মানব ইনসুলিন তৈরি করা হয়। মানুষের অগ্ন্যাশয় কোষ থেকে ইনসুলিন তৈরির জিন ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিডে যুক্ত করার পর, এককোষী এই ব্যাকটেরিয়া কীভাবে অবিকল মানুষের মতো ৫১টি অ্যামাইনো অ্যাসিডযুক্ত মানব ইনসুলিন তৈরি করতে পারে?

ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিডে মানুষের ইনসুলিন জিন প্রবেশ করানোর পর ব্যাকটেরিয়া কীভাবে মানুষের হুবহু ৫১টি অ্যামাইনো অ্যাসিডযুক্ত ইনসুলিন তৈরি করে?

  1. মানুষের জিন প্রবেশের ফলে ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব ক্রোমোজোম ধ্বংস হয়ে সম্পূর্ণ মানব কোষে রূপান্তরিত হয়
  2. ব্যাকটেরিয়া নিজে কোনো ইনসুলিন তৈরি করে না: এটি কেবল বাইরে থেকে যোগ করা কৃত্রিম দ্রবণ জমা রাখার পাত্র হিসেবে কাজ করে
  3. সর্বজনীন জেনেটিক কোড অনুযায়ী ব্যাকটেরিয়ার রাইবোজোম মানুষের জিনের কোডন পড়ে অবিকল ৫১টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের শৃঙ্খল তৈরি করে

যা বদলাতে পারবে

  • ধাপ: ১ থেকে ৬

যা মেপে দেখাবে

  • বর্তমান ধাপ
  • মোট ধাপ
  • অগ্রগতি (%)

চালানোর সময় খেয়াল করো

  • ধাপ ৩ ও ৪-এ কীভাবে রেস্ট্রিকশন এনজাইম ও লাইগেজ মানুষের জিনকে প্লাজমিডে যুক্ত করে এবং ধাপ ৬-এ ফার্মান্টারে কীভাবে ইনসুলিন তৈরি হয় তা লক্ষ্য করো।

নিজে করে দেখো

  1. কোন ধাপে ডিএনএ লাইগেজ এনজাইমের সাহায্যে মানুষের ইনসুলিন জিন ও প্লাজমিড জোড়া লেগে রিকম্বিন্যান্ট প্লাজমিড তৈরি হয়? সেই ধাপে যাও।
    ইঙ্গিত

    আণবিক আঠা হিসেবে কাজ করা লাইগেজ এনজাইমের ধাপটি দেখো (ধাপ ৪)।

  2. ফার্মান্টারে ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত বংশবৃদ্ধি ও খাঁটি মানব ইনসুলিন উৎপাদনের শেষ ধাপে যাও (অগ্রগতি ১০০%)।
    ইঙ্গিত

    স্লাইডার টেনে প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে যাও।

ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।

রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি: ব্যাকটেরিয়ায় মানব ইনসুলিন উৎপাদন

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি হলো কাঙ্ক্ষিত নতুন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো জীবের ডিএনএ-তে অন্য জীবের নির্দিষ্ট কার্যক্ষম জিন যুক্ত করার আধুনিক জীবপ্রযুক্তি। মানবদেহের অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন উৎপাদনকারী নির্দিষ্ট জিন পৃথক করা হয় এবং ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া থেকে প্লাজমিড ডিএনএ বের করা হয়। নির্দিষ্ট রেস্ট্রিকশন এনজাইম (আণবিক কাঁচি) দিয়ে উভয় ডিএনএ-কে কেটে একই ধরনের আঠালো প্রান্ত (sticky ends) তৈরি করা হয়। এরপর ডিএনএ লাইগেজ (আণবিক আঠা) এনজাইম দিয়ে মানুষের ইনসুলিন জিনটিকে প্লাজমিডে জোড়া লাগিয়ে রিকম্বিন্যান্ট প্লাজমিড তৈরি করা হয়। এই সংকর প্লাজমিডকে ট্রান্সফরমেশন প্রক্রিয়ায় নিরীহ ই. কোলাই পোষক ব্যাকটেরিয়ায় প্রবেশ করানো হয়। সর্বজনীন জেনেটিক কোড (universal genetic code) অনুযায়ী ব্যাকটেরিয়ার রাইবোজোম মানুষের জিনের কোডন পাঠ করে হুবহু ৫১টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের শৃঙ্খল সংশ্লেষ করে। ফার্মান্টারে এই ট্রান্সফর্মড ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত দ্বি-ভাজনের মাধ্যমে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় এবং স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ খাঁটি মানব ইনসুলিন উৎপাদিত হয়।

অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল

অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে মানুষের জিন প্রবেশ করালে ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব ক্রোমোজোম ধ্বংস হয়ে যায় বা ব্যাকটেরিয়াটি মানব কোষে রূপান্তরিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ব্যাকটেরিয়ার প্রধান ক্রোমোজোম সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে এবং স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়া চালায়: কেবল ক্ষুদ্র প্লাজমিডটি অতিরিক্ত বাহক হিসেবে কাজ করে। আবার কারও ধারণা হয় যে ব্যাকটেরিয়া কোনো প্রোটিন তৈরি করে না, এটি কেবল ইনসুলিন জমা রাখার নিষ্ক্রিয় পাত্র। বাস্তবে ব্যাকটেরিয়া নিষ্ক্রিয় কোনো পাত্র নয়: জীবদেহের জেনেটিক কোড সার্বজনীন হওয়ায় ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব ট্রান্সক্রিপশন ও ট্রান্সলেশন যন্ত্রপাতি (আরএনএ পলিমারেজ, রাইবোজোম ও টিআরএনএ) মানুষের জিনের কোডন পড়ে অবিকল সঠিক অ্যামাইনো অ্যাসিড ক্রমানুসারে সাজিয়ে কার্যকরী ইনসুলিন সংশ্লেষ করে।

যেসব ভুল ধারণা হয়

  • রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রবেশ করালে ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব ক্রোমোজোম মানুষের কোষে বদলে যায়
  • ব্যাকটেরিয়া নিজে ইনসুলিন তৈরি করে না, কেবল রাসায়নিক দ্রবণ জমা রাখে

বাস্তবে কোথায় দেখা যায়

  • বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ইনসেপ্টা ও স্কয়ারের মতো ওষুধ কারখানাগুলো আধুনিক ফার্মান্টারে রিকম্বিন্যান্ট ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া কালচার করে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের খাঁটি মানব ইনসুলিন তৈরি করছে, যা আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে রোগীর জীবন বাঁচাচ্ছে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) একই রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষতিকর ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বিটি বেগুন (Bt brinjal) উদ্ভাবন করেছে, যার ফলে কীটনাশকের ব্যবহার ৮০% হ্রাস পেয়েছে এবং কৃষকের অর্থনৈতিক লাভ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের টপিক