offSchoolবেটা

জীববিজ্ঞান · অধ্যায় ১৪

উদ্ভিদ টিস্যু কালচার: এক্সপ্লান্ট থেকে অবিকল চারা উৎপাদন

মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।

নরসিংদীর একজন কৃষক তার জমিতে উন্নত ও সুস্বাদু 'অমৃতসাগর' জাতের কলার বাগান করতে চান। সনাতন পদ্ধতিতে কলার তেউড় (sucker) রোপণ করলে পানামা রোগ ও বানচি টপ (bunchy top) ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার এবং ফলন অসমান হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর টিস্যু কালচার গবেষণাগার (laboratory) থেকে একটিমাত্র সুস্থ, নিরোগ ও উচ্চফলনশীল মাতৃউদ্ভিদের শীর্ষমুকুল (explant) থেকে উৎপাদিত ১০,০০০টি কলার অণুচারা (plantlet) সংগ্রহ করে রোপণ করলেন। কয়েক মাস পর দেখা গেল বাগানের ১০,০০০টি কলা গাছের প্রতিটিতেই মাতৃউদ্ভিদের মতো হুবহু একই উচ্চতা, একই মিষ্টতা, একই গুণাগুণ ও সমান ফলন পাওয়া গেছে—সবগুলো গাছই জিনগতভাবে অবিকল এক বা সোমাক্লোন (somaclone)। উদ্ভিদের প্রাকৃতিক যৌন প্রজননে বীজের চারায় যেখানে পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ ও নতুন প্রকরণ দেখা যায়, সেখানে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত সকল চারা জিনগতভাবে মাতৃউদ্ভিদের হুবহু অনুরূপ (১০০% অভিন্ন) হওয়ার মূল কারণ কোনটি?

টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত সকল অণুচারা (plantlet) জিনগতভাবে মাতৃউদ্ভিদের অবিকল অনুরূপ হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ কী?

  1. পুষ্টিমাধ্যমে প্রয়োগকৃত কৃত্রিম হরমোন ও রাসায়নিক উপাদান চারার জিনগুলোকে কৃত্রিমভাবে একই ছাঁচে রূপান্তরিত করে
  2. ক্যালাসের বহু কোষের মধ্যে পরাগায়ন ও নিষেকের মতো জিনগত সংমিশ্রণ ঘটে একই বৈশিষ্ট্যযুক্ত বীজ তৈরি হয়
  3. এক্সপ্লান্ট থেকে চারা পর্যন্ত কোষগুলো কেবল মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হওয়ায় মাতৃকোষের হুবহু ক্রোমোজোম ও জিনগত তথ্য অপরিবর্তিত থাকে

যা বদলাতে পারবে

  • টিস্যু কালচারের ধাপ: ১ থেকে ৬

যা মেপে দেখাবে

  • বর্তমান ধাপ
  • মোট ধাপ
  • অগ্রগতি (%)
  • প্রতি কোষে ক্রোমোজোম (2n)

চালানোর সময় খেয়াল করো

  • ধাপ ৪ ও ৫-এ ক্যালাস ও অণুচারা গঠনের সময় কোষগুলো কীভাবে বিভাজিত হচ্ছে এবং প্রতি কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা পরিবর্তিত হচ্ছে কি না লক্ষ্য করো!

নিজে করে দেখো

  1. কোন ধাপে এক্সপ্ল্যান্টের কোষগুলো মাইটোসিসে ভাগ হয়ে একটি অবিভেদিত কোষপিণ্ড তৈরি করে?
    ইঙ্গিত

    এই কোষপিণ্ডের নাম ক্যালাস।

ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।

উদ্ভিদ টিস্যু কালচার: মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে সোমাক্লোন (somaclone) সৃষ্টি

উদ্ভিদ টিস্যু কালচার বা অণুপ্রজনন (micropropagation) হলো একটি সম্পূর্ণ অযৌন ও অঙ্গজ প্রজনন পদ্ধতি। উদ্ভিদের প্রতিটি সজীব কোষের সম্পূর্ণ একটি নতুন উদ্ভিদে পরিণত হওয়ার এই সহজাত ক্ষমতাকে 'টটিপোটেন্সি' (totipotency) বলে। নির্বাচিত এক্সপ্লান্ট থেকে পুষ্টিমাধ্যমে ক্যালাস তৈরি, মুকুল সৃষ্টি এবং মূল উৎপাদন—সমগ্র প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে কোষগুলো কেবল 'মাইটোসিস' (mitosis) কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যাবৃদ্ধি করে। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় মাতৃকোষের ডিএনএ বা ক্রোমোজোম অবিকল প্রতিলিপিত (replicated) হয়ে দুটি অপত্য কোষে সমানভাবে বণ্টিত হয়। এখানে কোনো মিয়োসিস বিভাজন ঘটে না, কোনো জননকোষ (শুক্রাণু বা ডিম্বাণু) তৈরি হয় না এবং ক্রসিং ওভার (crossing over)-এর মাধ্যমে জিনের কোনো নতুন সংমিশ্রণ ঘটে না। ফলে একটিমাত্র এক্সপ্লান্ট থেকে উৎপাদিত দশ হাজার চারার প্রতিটিই মাতৃউদ্ভিদের ১০০% জিনগত প্রতিরূপ বা সোমাক্লোন (somaclone) হয়।

অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল

অনেকেরই ভুল ধারণা থাকে যে পুষ্টিমাধ্যমে (culture medium) যোগ করা কৃত্রিম হরমোন বা রাসায়নিক উপাদান চারার জিনগত গঠন পরিবর্তন করে কিংবা ক্যালাসের মধ্যে পরাগায়নের মতো কোনো যৌন সংমিশ্রণ ঘটে। প্রকৃতপক্ষে হরমোন (অক্সিন ও সাইটোকাইনিন) কেবল রাসায়নিক সংকেত প্রদান করে সুপ্ত জিনকে সক্রিয় করার মাধ্যমে কোষ বিভাজন এবং মুকুল ও মূল তৈরিতে উদ্দীপনা জোগায়, কিন্তু তারা ডিএনএ বা ক্রোমোজোমের গঠন বদলে দেয় না। এছাড়া টিস্যু কালচারে জননকোষের মিলন বা মিয়োসিস না ঘটায় কোনো নতুন বৈশিষ্ট্যের প্রকরণ সৃষ্টি হয় না; প্রতিটি চারা মাতৃউদ্ভিদের অবিকল বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

যেসব ভুল ধারণা হয়

  • পুষ্টিমাধ্যমের হরমোন ও রাসায়নিক উপাদান কোষের জিন পরিবর্তন করে তাদের অভিন্ন রূপ দেয়
  • টিস্যু কালচারে জননকোষ সৃষ্টি বা নিষেকের মতো জিনগত সংমিশ্রণ ঘটে

বাস্তবে কোথায় দেখা যায়

  • বাংলাদেশে নরসিংদী, বগুড়া ও টাঙ্গাইলে ভাইরাস ও পানামা রোগমুক্ত অমৃতসাগর ও মেহেরসাগর কলার বাণিজ্যিক চারা উৎপাদনে টিস্যু কালচার গবেষণাগারগুলো প্রতি বছর লাখ লাখ চারা সরবরাহ করে কৃষকদের ফলন ও আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করছে।
  • বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) টিস্যু কালচারের মেরিস্টেম কালচার (meristem culture) পদ্ধতির মাধ্যমে আলু ও জারবেরা ফুলের ভাইরাস-মুক্ত অণুগুটি (micro-tuber) বা প্রাক-ভিত্তি বীজ উৎপাদন করছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বীজ আমদানির ব্যয় সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে।

পাঠ্যবইয়ের টপিক