জন্ম হলে জীবের মৃত্যু অবধারিত। শুধু মৃত্যু ঘটলে একসময় সব প্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যেত; তা হয়নি, কারণ মৃত্যুর পাশাপাশি প্রজননের মাধ্যমে নতুন জীবের জন্ম হচ্ছে।
প্রজনন না হলে জীবের অস্তিত্ব বিলোপ হয়ে যেত। প্রজননের গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে বোঝা যায়। প্রতিটি জীবের মৃত্যু অবধারিত। প্রজননের মাধ্যমে নতুন বংশধর জন্ম নেয় বলে প্রজাতি টিকে থাকে।
ফুল হলো প্রজননের জন্য রূপান্তরিত বিশেষ ধরনের বিটপ, এবং উন্নত উদ্ভিদের প্রজনন অঙ্গ। একটি আদর্শ ফুলে পাঁচটি স্তবক থাকে: পুষ্পাক্ষ এবং তার উপর পরপর সাজানো বৃতি, দলমণ্ডল, পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবক।
সপুষ্পক উদ্ভিদের যৌন প্রজননে পরপর দুটি ধাপ: পরাগায়ন ও নিষেক। পরাগধানী থেকে পরাগরেণু একই ফুলের বা একই প্রজাতির অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরকে পরাগায়ন বলে; এটি ফল ও বীজ তৈরির পূর্বশর্ত।
প্রাণিজগতে প্রজনন দুই ধরনের: অযৌন প্রজনন ও যৌন প্রজনন। নিম্নশ্রেণির প্রাণীতে অযৌন প্রজনন হয়। এতে জননকোষের মিলন লাগে না, একটি প্রাণী থেকেই নতুন প্রাণী তৈরি হয়।
জীব কোন উপায়ে প্রজনন করবে, তা নির্ভর করে জীবের বৈশিষ্ট্যের উপর। প্রজননের পদ্ধতি প্রধানত দুই রকম, আর প্রতিটির ভেতরে কয়েকটি উপায় আছে। জননকোষের মিলন ছাড়াই একটি জীব থেকে নতুন জীব; অপত্য জীব মাতৃজীবের মতো।
যৌন প্রজননে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনকে নিষেক বলে। সক্রিয় শুক্রাণু ডিম্বাণুতে প্রবেশ করে এবং দুটির নিউক্লিয়াস মিলে জাইগোট তৈরি করে। নিষেক একটি সর্বজনীন জৈবিক প্রক্রিয়া, এবং এতে কিছু সময় লাগে।
বংশবিস্তার ও বংশ রক্ষার জন্য প্রজনন অত্যন্ত প্রয়োজন; এ প্রক্রিয়ায় মাতৃগর্ভে ভ্রূণ সৃষ্টি হয় এবং সন্তান জন্ম নেয়। মানুষ একলিঙ্গ প্রাণী, অর্থাৎ পুরুষ ও নারীর প্রজননের অঙ্গ আলাদা দেহে থাকে।
হরমোন হলো নালিহীন বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এক ধরনের জৈব রাসায়নিক পদার্থ, যা রাসায়নিক দূত হিসেবে সরাসরি রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিপাক ও শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
নিষেকের পর জাইগোট থেকে ধাপে ধাপে মাতৃগর্ভে ভ্রূণ গড়ে ওঠে। ক্লিভেজ: নিষেকের পরপরই জাইগোটে কোষ বিভাজন শুরু হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণু ধীরে ধীরে ডিম্বনালি বেয়ে জরায়ুর দিকে যায়।
আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জীবাণুর আক্রমণ থেকে দেহকে রক্ষা করে। এ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ শ্বেত রক্তকণিকা, যা রোগজীবাণু ধ্বংস করে, এবং অ্যান্টিবডি, যা জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার একটি আম বাগানে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদমান লক্ষ্য করল বাগানের গাছে প্রচুর মুকুল এসেছে এবং সেখানে মৌমাছি ও নানা পতঙ্গের আনাগোনা চলছে। তার চাচা বাগানের কয়েক পাশে বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছির বাক্স বসিয়েছেন। সাদমান লক্ষ্য করল, কিছু ফুল ঝরে যাচ্ছে কিন্তু অধিকাংশ ফুলের গর্ভাশয় দ্রুত স্ফীত হয়ে ছোট ছোট সবুজ গুটি আমে রূপান্তরিত হচ্ছে। তার চাচা জানালেন, ফুল থেকে মানসম্মত সুমিষ্ট আম এবং ভেতরে চারা গজানোর উপযোগী বীজ উৎপাদনের জন্য ফুলের পুং ও স্ত্রী উভয় অংশের সমন্বিত কার্যক্রম অপরিহার্য।
ক
পরাগায়ন (pollination) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
পরাগধানী থেকে পরাগরেণুর একই ফুলের অথবা একই প্রজাতির অন্য কোনো ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে পরাগায়ন বলে।
খ
সপুষ্পক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে 'দ্বি-নিষেক' (double fertilization) বলতে কী বোঝায় — ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
সপুষ্পক উদ্ভিদে পরাগনালী থেকে দুটি পুং-জননকোষ ভ্রূণথলিতে মুক্ত হয়। একটি পুং-জননকোষ (n) ডিম্বাণুর (n) সাথে মিলিত হয়ে ডিপ্লয়েড জাইগোট (2n) গঠন করে এবং অপর পুং-জননকোষটি (n) গৌণ নিউক্লিয়াসের (2n) সাথে মিলিত হয়ে ট্রিপ্লয়েড শস্য নিউক্লিয়াস (3n) তৈরি করে। একই সময়ে প্রায় একসাথে দুটি নিষেকের এই অনন্য ঘটনাকে দ্বি-নিষেক বলা হয়।
গ
উদ্দীপকে সাদমানের চাচার আম বাগানে মৌমাছির বাক্স স্থাপন কীভাবে ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে? পতঙ্গপরাগী ফুলের বৈশিষ্ট্যের আলোকে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
আম ফুল হলো একটি পতঙ্গপরাগী ফুল (entomophilous flower)। এর ফুলগুলো মিষ্টি গন্ধযুক্ত, মকরন্দ বা মধু ধারণ করে এবং এর পরাগরেণু আঠালো হয় যা পতঙ্গের গায়ে সহজে আটকে যায়।
বাগানে মৌমাছির বাক্স স্থাপন করার ফলে হাজার হাজার মৌমাছি মধু ও পরাগরেণু সংগ্রহের জন্য এক ফুল থেকে অন্য ফুলে ঘুরে বেড়ায়। এর ফলে:
১. আম ফুলের গর্ভমুণ্ডে পর্যাপ্ত পরাগরেণুর সফল ও কার্যকর পর-পরাগায়ন নিশ্চিত হয়।
২. পরাগায়নের সাফল্যের হার বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় গর্ভাশয়ে নিষেকের সম্ভাবনা শতভাগে পৌঁছায় এবং ফুল ঝরে পড়ার হার কমে যায়।
৩. নিষেকের পর গর্ভাশয়গুলো পুষ্ট হয়ে ফলে রূপান্তরিত হয়, যার ফলে বাগানে আমের সামগ্রিক ফলন বৃদ্ধি পায়। সুতরাং মৌমাছির বাক্স স্থাপন আম বাগানের ফলন বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।
ঘ
'উদ্দীপকে উল্লিখিত পুং ও স্ত্রী জননকোষ সৃষ্টি থেকে শুরু করে ফুলটি ফলে ও বীজে রূপান্তরিত হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তনগুলো একটি ধারাবাহিক জৈবিক প্রক্রিয়ার ফল' — উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখাও
উক্তিটি অত্যন্ত যথার্থ। ফুল থেকে সুমিষ্ট আম ও অঙ্কুরোদগমক্ষম বীজ সৃষ্টি একটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক পর্যায়ক্রমিক জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়:
১. গ্যামেট সৃষ্টি: পরাগধানীতে রেণু মাতৃকোষ থেকে মিয়োসিস বিভাজনে পরাগরেণু এবং পরাগনালীতে দুটি পুং-জননকোষ (n) উৎপন্ন হয়। একই সাথে ডিম্বকের ভেতর মেগাস্পোর মাতৃকোষ থেকে হ্যাপ্লয়েড ডিম্বাণু (n) ও গৌণ নিউক্লিয়াস (2n) সহ ৮-নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট ভ্রূণথলি গঠিত হয়।
২. পরাগায়ন: পতঙ্গের মাধ্যমে পরাগরেণু পুংস্তবক থেকে স্ত্রীস্তবকের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়।
৩. পরাগনালী বৃদ্ধি ও নিষেক: পরাগরেণু অঙ্কুরিত হয়ে পরাগনালী গর্ভদণ্ড ভেদ করে ডিম্বকে প্রবেশ করে। সেখানে দ্বি-নিষেক ঘটে: ডিম্বাণু ও পুং-জননকোষের মিলনে ডিপ্লয়েড জাইগোট (2n) এবং গৌণ নিউক্লিয়াসের সাথে দ্বিতীয় পুং-জননকোষের মিলনে ট্রিপ্লয়েড শস্য (3n) সৃষ্টি হয়।
৪. ফল ও বীজ রূপান্তর: নিষেকের পর বৃতি ও দলমণ্ডল শুকিয়ে ঝরে যায়। নিষেকের উদ্দীপনায় হরমোনের প্রভাবে গর্ভাশয়টি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে রসালো ও মিষ্টি আমে (ফলে) এবং গর্ভাশয় প্রাচীর ফলত্বকে পরিণত হয়। একই সাথে ডিম্বকটি রূপান্তরিত হয়ে অঙ্কুরোদগমক্ষম আঁটিতে (বীজে) এবং জাইগোটটি সুপ্ত ভ্রূণে পরিণত হয়।
অতএব, প্রতিটি ধাপ পূর্ববর্তী ধাপের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এটি একটি অবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক জৈবিক প্রক্রিয়া।