খুলনার সুন্দরবন অঞ্চলের একটি নদী সংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে শিক্ষার্থীরা বাস্তুতন্ত্রের উপাদানসমূহ পর্যবেক্ষণ করল। সেখানে কেওড়া ও সুন্দরী গাছের পাতা এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন সূর্যালোক ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে। হরিণ ও ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ গাছের পাতা খায় এবং নদী থেকে ধরা চিংড়ি ও ছোট মাছ বিভিন্ন জলজ পাখি ও মাঝারি খাদক প্রাণী খায়। বনটিতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার হরিণ ও বুনো শূকর শিকার করে। তবে সম্প্রতি অনিয়ন্ত্রিতভাবে হরিণ শিকার এবং ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের নিধনের ফলে বনের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
- ক
বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) কাকে বলে?
উত্তর দেখাও
যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জীবসম্প্রদায় এবং সেখানকার জড় পরিবেশের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠা স্বয়ংসর্ম্পূণ কার্যকরী প্রাকৃতিক একককে বাস্তুতন্ত্র বলে।
- খ
বাস্তুতন্ত্রের শক্তি পিরামিড সর্বদা খাড়া (শীর্ষমুখী) হয় কেন — ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তিস্তরে অবস্থিত সবুজ উদ্ভিদ বা উৎপাদকরা সূর্যালোকের সাহায্যে সর্বাধিক পরিমাণ রাসায়নিক শক্তি আবদ্ধ করে, ফলে উৎপাদক স্তরে শক্তি সর্বোচ্চ থাকে। শক্তি স্থানান্তরের ১০% নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ট্রফিক স্তর থেকে পরবর্তী স্তরে যাওয়ার সময় প্রায় ৯০% শক্তি শ্বসন ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় পরিবেশে তাপ হিসেবে অপচয় হয় এবং মাত্র ১০% শক্তি পরবর্তী স্তরে সঞ্চিত হয়। ফলে প্রতিটি উচ্চতর স্তরে শক্তির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে এবং তা কখনোই ওপরের স্তরে বৃদ্ধি পায় না; তাই শক্তির পরিমাণের ভিত্তিতে অঙ্কিত পিরামিড সর্বদা নিচের দিকে চওড়া এবং ওপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে খাড়া বা শীর্ষমুখী হয়।
- গ
উদ্দীপকের জীবগুলোর সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত খাদ্যজাল (food web) তৈরি করে এর বিভিন্ন ট্রফিক স্তর চিহ্নিত করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের জীবগুলোর পারস্পরিক খাদ্য সম্পর্কের ভিত্তিতে সুন্দরবনের খাদ্যজালটি নিম্নরূপ খাদ্যশৃঙ্খলগুলোর মিলনে গঠিত: ১. কেওড়া/সুন্দরী পাতা (উৎপাদক) → হরিণ (১ম খাদক) → রয়েল বেঙ্গল টাইগার (সর্বোচ্চ খাদক)। ২. কেওড়া/সুন্দরী পাতা (উৎপাদক) → কীটপতঙ্গ (১ম খাদক) → জলজ পাখি (২য় খাদক)। ৩. ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (উৎপাদক) → চিংড়ি/ছোট মাছ (১ম খাদক) → জলজ পাখি (২য় খাদক)। ৪. উদ্ভিদের মূল ও কন্দ (উৎপাদক) → বুনো শূকর (১ম ও ২য় খাদক/সর্বভুক) → রয়েল বেঙ্গল টাইগার (সর্বোচ্চ খাদক)।
বিভিন্ন ট্রফিক স্তরের শনাক্তকরণ: • ১ম ট্রফিক স্তর (উৎপাদক): সুন্দরী ও কেওড়া গাছ, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন। • ২য় ট্রফিক স্তর (তৃণভোজী / ১ম স্তরের খাদক): হরিণ, কীটপতঙ্গ, চিংড়ি ও ছোট মাছ। • ৩য় ট্রফিক স্তর (মাংসাশী / ২য় স্তরের খাদক): জলজ পাখি; সর্বভুক বুনো শূকর (উদ্ভিদ খেলে ২য় স্তরে, প্রাণী খেলে ৩য় স্তরে)। • সর্বোচ্চ ট্রফিক স্তর (সর্বোচ্চ খাদক): রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
- ঘ
উদ্দীপকে উল্লিখিত হরিণ শিকার ও উদ্ভিদ নিধন অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতার ওপর কী বিরূপ প্রভাব পড়বে? বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকে উল্লিখিত হরিণ শিকার এবং ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের নিধন অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এর কারণ ও প্রভাব নিম্নরূপ: ১. উৎপাদক স্তরের সংকট: কেওড়া ও সুন্দরী গাছ নিধনের ফলে সৌরশক্তি আবদ্ধকরণের পরিমাণ হ্রাস পাবে, যা বাস্তুতন্ত্রের মোট প্রাথমিক উৎপাদন কমিয়ে দেবে এবং সমগ্র খাদ্যজালের শক্তির ভিত্তি দুর্বল করবে। ২. বাঘের খাদ্যাভাব ও মানব-প্রাণী সংঘাত: হরিণ হলো সুন্দরবনের প্রধান তৃণভোজী স্তন্যপায়ী এবং বাঘের অন্যতম প্রধান খাদ্য। অনিয়ন্ত্রিত হরিণ শিকারের ফলে বাঘ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে; ফলে হয় খাদ্যাভাবে বাঘের সংখ্যা হ্রাস পাবে অথবা ক্ষুধার্ত বাঘ খাদ্যের সন্ধানে বন সংলগ্ন লোকালয়ে প্রবেশ করে মানুষ ও গবাদিপশুর ওপর আক্রমণ চালাবে। ৩. খাদ্যজালের জটিলতা নষ্ট হওয়া: বাস্তুতন্ত্রে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পেলে খাদ্যজাল সরল হয়ে পড়ে। একটি নির্দিষ্ট খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়লে উচ্চতর স্তরের খাদকদের বিকল্প শিকার গ্রহণের সুযোগ থাকে না, ফলে সমগ্র প্রাণী সম্প্রদায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ৪. সার্বিক বাস্তুতন্ত্রের অস্থিতিশীলতা: হরিণ কমে গেলে উদ্ভিদের বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটে এবং বন উজাড় হওয়ায় প্রাকৃতিক উপকূলীয় সুরক্ষাও নষ্ট হয়, যা বাস্তুতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলার ঝুঁকিতে ফেলে। অতএব, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখতে হরিণ শিকার সম্পূর্ণরূপে দমন এবং ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ অতীব জরুরি।