কুমিল্লার একটি গ্রামের ৬০ বছর বয়সী গৃহিণী রাবেয়া বেগম বেশ কিছুদিন ধরে পিঠে ও কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করছিলেন। একদিন ঘরের মেঝেতে সামান্য হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে তাঁর নিতম্বের অস্থি ভেঙে যায়। চিকিৎসকের কাছে গেলে এক্স-রে ও অস্থি ঘনত্ব পরীক্ষায় দেখা গেল তাঁর অস্থির ক্যালসিয়াম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অস্থিগুলো দুর্বল, ফাঁপা ও ভঙ্গুর হয়ে গেছে; চিকিৎসক জানালেন তিনি ওসটিওপরোসিস রোগে আক্রান্ত। অন্যদিকে, তাঁর ৬৫ বছর বয়সী স্বামী কৃষক কাসেম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে হাঁটু ও আঙুলের অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা, সন্ধিস্থল ফুলে যাওয়া এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সন্ধি শক্ত হয়ে নড়াচড়া করতে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ভুগছেন; চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানালেন কাসেম মিয়ার অস্থিসন্ধির তরুণাস্থি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে প্রদাহ (আর্থ্রাইটিস) সৃষ্টি হয়েছে।
- ক
টেনডন (Tendon) কী?
উত্তর দেখাও
পেশির প্রান্তভাগ রজ্জুর মতো শক্ত ও ঘন হয়ে অস্থির সাথে যে দৃঢ় শ্বেত তন্তুময় যোজক কলার মাধ্যমে যুক্ত থাকে, তাকে টেনডন (Tendon) বলে।
- খ
বাইসেপস ও ট্রাইসেপসকে অ্যান্টাগোনিস্টিক (বিপরীতমুখী) পেশি বলা হয় কেন—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
যেসব পেশি একই অস্থিসন্ধিতে পরস্পরের বিপরীতমুখী ক্রিয়া সম্পাদন করে অঙ্গ সঞ্চালন ঘটায়, তাদের অ্যান্টাগোনিস্টিক বা বিপরীতমুখী পেশি বলে। হাতের কনুই সন্ধিতে বাইসেপস পেশি সংকুচিত হলে কনুই ভাঁজ হয়ে হাত কাঁধের দিকে উঠে আসে (ফ্লেক্সন), অন্যদিকে এর বিপরীত ট্রাইসেপস পেশি সংকুচিত হলে কনুই সোজা হয়ে হাত প্রসারিত হয় (এক্সটেনশন); অর্থাৎ একটি পেশির সংকোচন অপরটির বিপরীতমুখী চলন সৃষ্টি করে বলে এদের অ্যান্টাগোনিস্টিক পেশি বলা হয়।
- গ
উদ্দীপকে রাবেয়া বেগমের আক্রান্ত রোগটির কারণ ও লক্ষণ পাঠ্যপুস্তকের আলোকে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকে রাবেয়া বেগম ওসটিওপরোসিস (Osteoporosis) বা অস্থিক্ষয় রোগে আক্রান্ত। কারণ: ১. খাদ্যে পুষ্টির অভাব: দীর্ঘদিন খাদ্যে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন D-এর ঘাটতি থাকলে অস্থি গঠনের তুলনায় ক্ষয়ের হার বৃদ্ধি পায়। ২. হরমোনজনিত পরিবর্তন: রজনিবৃত্তির (menopause) পর নারীদের দেহে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় অস্থি থেকে ক্যালসিয়াম দ্রুত অপসারিত হয়। ৩. বয়স ও কায়িক শ্রমের অভাব: বার্ধক্যজনিত কারণে অস্থির কোলাজেন ও খনিজ ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এবং অলস জীবনযাপন। লক্ষণ: ১. অস্থি দুর্বল, ছিদ্রযুক্ত ও ভঙ্গুর হয়ে যায়, ফলে সামান্য আঘাতেই অস্থি (বিশেষত নিতম্ব, মেরুদণ্ড ও কবজি) ভেঙে যায়। ২. পিঠে, কোমরে ও অস্থিতে দীর্ঘস্থায়ী তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ৩. পেশির শক্তি হ্রাস পায় এবং মেরুদণ্ডের অস্থি সংকুচিত হয়ে দেহের উচ্চতা কিছুটা কমে যায় বা দেহ কুঁজো হয়ে পড়ে।
- ঘ
'উদ্দীপকের রাবেয়া বেগম ও কাসেম মিয়ার রোগ দুটি ভিন্ন প্রকৃতির এবং এদের প্রতিকারে সুনির্দিষ্ট জীবনধারা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রয়োজন'—বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের আলোকে বিশ্লেষণ নিম্নরূপ: ১. রোগ দুটির ভিন্ন প্রকৃতি: রাবেয়া বেগমের সমস্যা ওসটিওপরোসিস, যা সমগ্র অস্থির ভেতরের খনিজ লবণ (ক্যালসিয়াম) ক্ষয়জনিত রোগ; এতে অস্থি ফাঁপা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাসেম মিয়ার সমস্যা আর্থ্রাইটিস (অস্থিসন্ধির বাত), যা মূলত দুটি অস্থির সংযোগস্থলের তরুণাস্থির ক্ষয়, প্রদাহ এবং সাইনুভিয়াল ঝিল্লির অস্বাভাবিকতা; এটি সমগ্র অস্থির নয় বরং নির্দিষ্ট অস্থিসন্ধির সমস্যা। ২. রাবেয়া বেগমের প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
- পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন D সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য (দুধ, ডিম, পনির, মলা-ঢেলা মাছ, সয়াবিন ও সবুজ শাকসবজি) গ্রহণ নিশ্চিত করা।
- প্রতিদিন সকালের নরম রোদে অন্তত ১৫–২০ মিনিট অবস্থান করা, যা ত্বকে ভিটামিন D তৈরিতে সাহায্য করে।
- অস্থি মজবুত রাখতে নিয়মিত হালকা কায়িক পরিশ্রম ও হাঁটাচলা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনে ক্যালসিয়াম সম্পূরক ও ওষুধ গ্রহণ করা। ৩. কাসেম মিয়ার প্রতিকার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা:
- আক্রান্ত অস্থিসন্ধির ওপর অতিরিক্ত শারীরিক চাপ, সিঁড়ি ভাঙা বা ভারী ওজন বহন পরিহার করা।
- সন্ধির সচলতা বজায় রাখতে চিকিৎসকের নির্দেশনায় নিয়মিত মৃদু ব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপি করা।
- ব্যথা কমাতে আক্রান্ত সন্ধিতে কুসুম গরম সেঁক প্রয়োগ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রদাহরোধী ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করা। এছাড়া গেঁটেবাত বা ইউরিক এসিডের সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত প্রোটিন ও পিউরিনযুক্ত খাবার (যেমন—রেড মিট, অতিরিক্ত ডাল) নিয়ন্ত্রণ করা। ৪. উপসংহার: একটি রোগ অস্থির ভেতরের ঘনত্ব হারানোর সাথে সম্পর্কিত এবং অপরটি অস্থিসন্ধির তরুণাস্থির প্রদাহ ও ক্ষয়ের সাথে জড়িত। সুতরাং রোগ দুটির শারীরবৃত্তীয় প্রকৃতি যেমন ভিন্ন, তেমনি এদের প্রতিকারে খাদ্যাভ্যাস, কায়িক শ্রম ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কৌশলও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাই উদ্দীপকের বক্তব্যটি যথার্থ।