নারায়ণগঞ্জের একটি কুটির শিল্প রাসায়নিক কারখানায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পরিষ্কারক সামগ্রীর বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিদর্শন করল। কারখানাটিতে দুটি পৃথক ইউনিটে নিম্নোক্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলো পরিচালিত হয়: ১ম ইউনিট: উদ্ভিজ্জ সয়াবিন তেলের [গ্লিসারাইল স্টিয়ারেট, (C₁₇H₃₅COO)₃C₃H₅] সাথে কস্টিক সোডার (NaOH) গাঢ় জলীয় দ্রবণ মিশিয়ে ফুটিয়ে সাবান ও উপজাত হিসেবে গ্লিসারিন তৈরি করা হলো এবং সাবানকে আলাদা করতে ব্রাইন (NaCl) যোগ করা হলো। ২য় ইউনিট: শুষ্ক কলিচুন বা স্লেকড চুন [Ca(OH)₂]-এর ওপর ৪০ °C তাপমাত্রায় ক্লোরিন (Cl₂) গ্যাস চালনা করে শক্তিশালী পরিষ্কারক ও জীবাণুনাশক যৌগ 'A' প্রস্তুত করা হলো।
- ক
সাবানায়ন (Saponification) কী?
উত্তর দেখাও
তেল বা চর্বিকে ক্ষার (যেমন—সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড) সহযোগে আর্দ্রবিশ্লেষিত করে সাবান ও গ্লিসারিন তৈরির প্রক্রিয়াকে সাবানায়ন বলে।
- খ
১ম ইউনিটে সাবান তৈরির পর মিশ্রণে ব্রাইন বা খাবার লবণ (NaCl) যোগ করা হয় কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
সাবানায়ন বিক্রিয়া শেষে উৎপন্ন সাবান জলীয় দ্রবণে কিছুটা দ্রবীভূত ও কলয়েড আকারে নিলম্বিত থাকে। এই মিশ্রণে অতিরিক্ত খাবার লবণ (NaCl) বা ব্রাইন যোগ করলে দ্রবণে সোডিয়াম আয়নের (Na⁺) আধিক্য ঘটে। এর ফলে সম-আয়ন প্রভাবের (common-ion effect) কারণে সাবানের দ্রাব্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং সাবান কঠিন পিণ্ড হিসেবে তরল উপরিভাগে ভেসে ওঠে (salting out), যা সহজেই ছাঁকন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথক করা সম্ভব হয়।
- গ
উদ্দীপকের ২য় ইউনিটে প্রস্তুতকৃত 'A' যৌগটির প্রস্তুতি ও রঙিন কাপড়ে এর বিরঞ্জন ক্রিয়ার কৌশল সমীকরণসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর দেখাও
উদ্দীপকের ২য় ইউনিটে প্রস্তুতকৃত যৌগ 'A' হলো ব্লিচিং পাউডার [রাসায়নিক সংকেত Ca(OCl)Cl বা CaOCl₂]।
প্রস্তুতি সমীকরণ: ৪০ °C তাপমাত্রায় শুষ্ক কলিচুনের ওপর ক্লোরিন গ্যাস চালনা করলে ব্লিচিং পাউডার উৎপন্ন হয়: Ca(OH)₂ + Cl₂ → Ca(OCl)Cl + H₂O
বিরঞ্জন ক্রিয়ার কৌশল: ব্লিচিং পাউডার পানির সাথে বিক্রিয়া করে হাইপোক্লোরাস এসিড (HClO) তৈরি করে: 2Ca(OCl)Cl + 2H₂O → CaCl₂ + Ca(OH)₂ + 2HClO উৎপন্ন হাইপোক্লোরাস এসিড অত্যন্ত অস্থায়ী হওয়ায় তা দ্রুত বিশ্লিষ্ট হয়ে হাইড্রোক্লোরিক এসিড ও জায়মান অক্সিজেন ([O]) উৎপন্ন করে: HClO → HCl + [O] এই তীব্র জারণ ক্ষমতাসম্পন্ন জায়মান অক্সিজেন রঙিন কাপড়ের জৈব রঞ্জক পদার্থের সাথে যুক্ত হয়ে তাকে জারিত করে বর্ণহীন যৌগে রূপান্তর করে: রঙিন পদার্থ + [O] → বর্ণহীন পদার্থ। এভাবেই 'A' যৌগটি কাপড়ের দাগ দূর করে বিরঞ্জন ঘটায়।
- ঘ
১ম ইউনিটে উৎপন্ন সাবানের আণবিক গঠন বিশ্লেষণ করে ময়লা পরিষ্কার করার কৌশল ব্যাখ্যা করো এবং খর পানিতে সাবানের কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর দেখাও
সাবানের আণবিক গঠন ও পরিষ্কার করার কৌশল: ১ম ইউনিটে প্রস্তুতকৃত সাবান হলো সোডিয়াম স্টিয়ারেট (C₁₇H₃₅COONa)। পানিতে দ্রবীভূত হলে এটি স্টিয়ারেট অ্যানায়ন (C₁₇H₃₅COO⁻) ও সোডিয়াম ক্যাটায়নে (Na⁺) বিশ্লিষ্ট হয়। স্টিয়ারেট আয়নের দুটি ভিন্ন ধর্মী অংশ রয়েছে: ১. হাইড্রোকার্বন লেজ (-C₁₇H₃₅): এটি অপোলার এবং পানি-বিকর্ষী বা হাইড্রোফোবিক (hydrophobic), কিন্তু তেল বা গ্রিজের প্রতি আকৃষ্ট (লিপোফিলিক)। ২. আয়নিক মাথা (-COO⁻): এটি পোলার ও ঋণাত্মক চার্জযুক্ত এবং পানি-আকর্ষী বা হাইড্রোফিলিক (hydrophilic)।
ময়লাযুক্ত কাপড় সাবান মিশ্রিত পানিতে ভেজানো হলে সাবান অণুর অপোলার হাইড্রোফোবিক লেজগুলো কাপড়ের তেলের ময়লার দিকে আকৃষ্ট হয়ে ময়লার ভেতরে প্রবেশ করে। অপরপক্ষে, পোলার হাইড্রোফিলিক মাথাগুলো পানির দিকে মুখ করে বাইরে অবস্থান করে। ফলে তেলের ময়লা কণিকাকে ঘিরে অণুগুচ্ছের গোলাকার কাঠামো তৈরি হয়, যাকে মাইসেল (micelle) বলে। কাপড় নাড়াচাড়া বা ঘষলে পানির আকর্ষণে এই তেলের কণাগুলো কাপড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পানিতে প্রলম্বিত ইমালশন তৈরি করে এবং পানির স্রোতে ধুয়ে যায়।
খর পানিতে সাবানের সীমাবদ্ধতা: খর পানিতে দ্রবীভূত ক্যালসিয়াম (Ca²⁺) ও ম্যাগনেসিয়াম (Mg²⁺) আয়ন থাকে। সাবান খর পানিতে যোগ করলে সাবানের স্টিয়ারেট অ্যানায়ন এই আয়নগুলির সাথে বিক্রিয়া করে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম স্টিয়ারেট ও ম্যাগনেসিয়াম স্টিয়ারেটের আঠালো তলানি বা গাদ (scum) তৈরি করে: 2C₁₇H₃₅COO⁻ + Ca²⁺ → (C₁₇H₃₅COO)₂Ca ↓ যতক্ষণ পর্যন্ত খর পানির সমস্ত Ca²⁺ ও Mg²⁺ আয়ন তলানি হিসেবে অপসারিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ফেনা তৈরি হয় না। এতে বিপুল পরিমাণ সাবান অপচয় হয় এবং আঠালো গাদ কাপড়ের সুতায় আটকে কাপড়ের ক্ষতি করে। তাই খর পানিতে সাবান অকার্যকর ও অপচয়মূলক, যেখানে সিন্থেটিক ডিটারজেন্ট অদ্রবণীয় তলানি তৈরি না করে চমৎকার পরিষ্কার করে।