লবণ পানিতে আলুর সংকোচন: অভিস্রবণ
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
সালাদ বা রান্নার জন্য আলুর টুকরায় লবণ মাখিয়ে রাখলে বা আলুর টুকরাকে লবণ পানিতে রাখলে কিছুক্ষণের মধ্যে তা থেকে পানি বের হয়ে আলু নরম ও কুঁচকে যায়। একটি সতেজ আলুর (উদ্ভিদ কোষ) কোষরসের দ্রবের ঘনত্ব ০.৩ mol/L। আলুটিকে যদি ১.২ mol/L ঘনত্বের একটি লবণ দ্রবণে ডুবিয়ে রাখা হয়, তবে বৈষম্যভেদ্য কোষঝিল্লি ভেদ করে পানির সামগ্রিক প্রবাহ কোন দিকে ঘটবে?
১.২ mol/L লবণ দ্রবণে আলুর কোষ থেকে পানি কোন দিকে যাবে?
- আলুর কোষ থেকে পানি বাইরে বের হয়ে আসবে (বহিঃঅভিস্রবণ) এবং আলু কুঁচকে যাবে
- বাইরের ঘন লবণ দ্রবণ থেকে পানি আলুর কোষে ঢুকবে এবং কোষটি আরও ফুলে উঠবে
- পানির কোনো নিট প্রবাহ হবে না — উদ্ভিদের দৃঢ় কোষপ্রাচীর পানি বের হতে সম্পূর্ণ বাধা দেয়
যা বদলাতে পারবে
- বাইরের দ্রবণের ঘনত্ব (লবণ পানি): ০ থেকে ৩ mol/L
- কোষের ধরন: উদ্ভিদ কোষ (আলু — কোষপ্রাচীরযুক্ত), প্রাণী কোষ (রক্তকণিকা — কোষপ্রাচীরহীন)
যা মেপে দেখাবে
- পানির সামগ্রিক প্রবাহের দিক
- কোষের আপেক্ষিক আয়তন (V/V₀)
- কোষের বাহ্যিক অবস্থা
- অভিস্রবণ চাপের পার্থক্য (ΔΠ) (atm)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- বাইরের দ্রবণের ঘনত্ব ১.২ mol/L এ নিয়ে দেখো—পানির প্রবাহ কোন দিকে হয় এবং কোষের আয়তন কমে না বাড়ে? এরপর ০ mol/L (বিশুদ্ধ পানি) দিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষের তুলনা করো।
নিজে করে দেখো
- হাসপাতালের স্যালাইনের মতো: এমন দ্রবণ বেছে নাও যাতে লোহিত রক্তকণিকা (প্রাণীকোষ) ফোলেও না, চুপসেও না।
ইঙ্গিত
বাইরের আর ভেতরের দ্রবের ঘনমাত্রা সমান হলে কী হয়?
- এমন দ্রবণ বেছে নাও যাতে একটি লোহিত রক্তকণিকা ফেটে যায়। একই দ্রবণে উদ্ভিদকোষ কি ফাটে?
ইঙ্গিত
পানি বেশি দ্রবের দিকে যায়। প্রাণীকোষের কোষপ্রাচীর নেই।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
অভিস্রবণ ও প্লাজমোলাইসিস: পানি কম দ্রবণ-ঘনত্ব থেকে বেশি দ্রবণ-ঘনত্বের দিকে প্রবাহিত হয়
অভিস্রবণ হলো একটি বিশেষ ধরনের ব্যাপন। যখন দুটি ভিন্ন ঘনত্বের দ্রবণ একটি বৈষম্যভেদ্য বা অর্ধভেদ্য পর্দা (যেমন প্লাজমালেমা বা কোষঝিল্লি) দ্বারা পৃথক থাকে, তখন দ্রাবক (পানি) কম দ্রবের ঘনত্বের দ্রবণ (উচ্চ পানি বিভব) থেকে বেশি দ্রবের ঘনত্বের দ্রবণের (নিম্ন পানি বিভব) দিকে প্রবাহিত হয়। আলুর কোষরসের দ্রবের ঘনত্ব ০.৩ mol/L এবং বাইরের লবণ দ্রবণের ঘনত্ব ১.২ mol/L। বাইরের দ্রবণ বেশি ঘন (হাইপারটনিক) হওয়ায় আলুর কোষ থেকে পানি কোষঝিল্লি ভেদ করে বাইরে বের হয়ে যায় (বহিঃঅভিস্রবণ বা Exosmosis)। এর ফলে কোষের প্রোটোপ্লাস্ট সংকুচিত হয়ে ভেতরের দিকে গুটিয়ে আসে, যাকে প্লাজমোলাইসিস (Plasmolysis) বলে। কোষের রসস্ফীতি নষ্ট হওয়ায় আলুর টুকরা নরম ও কুঁচকে যায়। বিপরীতভাবে, আলুর কোষকে বিশুদ্ধ পানিতে (০ mol/L) রাখলে অন্তঃঅভিস্রবণের মাধ্যমে পানি ভেতরে ঢুকে কোষ স্ফীত হয়; তবে দৃঢ় সেলুলোজ কোষপ্রাচীর থাকায় উদ্ভিদ কোষ ফেটে যায় না (আয়তন ১.১ গুণেই সীমাবদ্ধ থাকে)। কিন্তু প্রাণী কোষে কোনো কোষপ্রাচীর না থাকায় তা অতিরিক্ত পানি শোষণে ফেটে (Lysis) যায়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে সাধারণ ব্যাপনের ধারণার সাথে গুলিয়ে মনে করে দ্রব্যের মতো পানিও বেশি ঘন দ্রবণ থেকে কম ঘন দ্রবণে প্রবাহিত হবে। কিন্তু অভিস্রবণে দ্রাবক (পানি) নিজের বেশি ঘনত্বের স্থান (যেখানে দ্রবের ঘনত্ব কম) থেকে কম ঘনত্বের পানির দিকে (যেখানে দ্রবের ঘনত্ব বেশি) প্রবাহিত হয়। আবার অনেকে মনে করে উদ্ভিদের কোষপ্রাচীর পানি বের হতে বাধা দেয়। প্রকৃতপক্ষে সেলুলোজের কোষপ্রাচীর সম্পূর্ণ ভেদ্য (Permeable), এটি পানি ও দ্রব উভয়কেই স্বাধীনভাবে চলাচল করতে দেয়; পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভেতরের বৈষম্যভেদ্য প্লাজমা পর্দা বা কোষঝিল্লি। তাই লবণ পানিতে দিলে আলুর ভেতরে পানি প্রবেশ করে না বা আটকে থাকে না, বরং দ্রুত বাইরে বের হয়ে যায়।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- পানি উচ্চ দ্রবের ঘনত্ব থেকে নিম্ন দ্রবের ঘনত্বের দিকে প্রবাহিত হয়
- উদ্ভিদের সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় পানি চলাচল সম্পূর্ণ আটকে দেয়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- মাছ ও কাঁচা আম সংরক্ষণ (লবণ মাখানো ও আচার তৈরি): ইলিশ মাছে বা আচারের আমে লবণ মাখিয়ে রাখলে বহিঃঅভিস্রবণের মাধ্যমে মাছের টিস্যু ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কোষ থেকে সব পানি বাইরে বেরিয়ে আসে। পানিশূন্য অবস্থায় পচনশীল জীবাণু বাঁচতে বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না, ফলে খাদ্য দীর্ঘদিন টাটকা থাকে।
- ইফতারের প্রস্তুতিতে কিশমিশ ও ছোলা ভেজানো: শুকনা কিশমিশ বা ছোলাকে সাধারণ পানিতে ভিজিয়ে রাখলে অন্তঃঅভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় পানি কোষের ভেতর প্রবেশ করে। এতে পানিশূন্য কুঁচকানো কিশমিশ ও ছোলা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফুলে সতেজ, রসালো ও নরম হয়ে ওঠে।