ক্রান্তি কোণ ও পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
বাসাবাড়িতে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের জন্য কাচের তৈরি অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল ব্যবহৃত হয়। ক্যাবলের ভেতরের কাচ কোরের প্রতিসরাঙ্ক n₁ = ১.৫ এবং চারপাশের মাধ্যম বাতাসের প্রতিসরাঙ্ক n₂ = ১.০। এই দুই মাধ্যমের সংকট কোণ বা ক্রান্তি কোণ প্রায় ৪২° (বা ৪১.৮°)। শুরুতে ক্যাবলের ভেতর ৩০° আপতন কোণে আলো পাঠানো হলে তা বাতাসে প্রতিসরিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। প্রকৌশলী যদি আপতন কোণ বাড়িয়ে সংকট কোণের চেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৫০° করেন, তবে আলোকরশ্মিটির কী ঘটবে?
আপতন কোণ ৫০° (সংকট কোণ ৪২°-এর বেশি) করা হলে আলোকরশ্মিটির কী ঘটবে?
- আলো বিভেদতল ঘেঁষে ৯০° কোণেই চলে যাবে — সংকট কোণের পর প্রতিসরণ কোণ আর বাড়তে পারে না
- আলো কাচ ভেদ করে বাতাসে বেরিয়ে যাবে — স্বচ্ছ কাচের বিভেদতল থেকে আলো কখনোই সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হতে পারে না
- আলো আর বাইরে যাবে না; কাচের ভেতরেই ৫০° কোণে সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হবে
যা বদলাতে পারবে
- আপতন কোণ: ০ থেকে ৮৫ °
যা মেপে দেখাবে
- সংকট কোণ (θc) (°)
- প্রতিসরণ কোণ (r) (°)
- বিচ্যুতি কোণ (δ) (°)
- পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন
চালানোর সময় খেয়াল করো
- আপতন কোণের মান বাড়িয়ে সংকট কোণ (θc ≈ ৪১.৮°) পার করে দেখো। প্রতিসরিত রশ্মিটি কি বাতাসে থাকে, নাকি কাচের ভেতরেই সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে?
নিজে করে দেখো
- আলোকে ফাইবারের ভেতরে আটকে রাখে এমন সবচেয়ে ছোট আপতন কোণ (পূর্ণ ডিগ্রিতে) খুঁজে বের করো।
ইঙ্গিত
আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বড় হলেই পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হয়।
- আলো কাচ থেকে বাতাসে বের হবে, কিন্তু প্রতিসরণ কোণ অন্তত ৬০° হবে — এমন আপতন কোণ বেছে নাও।
ইঙ্গিত
ঘন থেকে হালকা মাধ্যমে গেলে আলো অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। সংকট কোণের কাছে গেলে কী হয়?
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ও ক্রান্তি কোণ
আলোক রশ্মি যখন ঘন মাধ্যম (যেমন কাচ, n₁ = ১.৫) থেকে হালকা মাধ্যমে (যেমন বায়ু, n₂ = ১.০) প্রবেশ করে, তখন প্রতিসরিত রশ্মি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। আপতন কোণ (i) বাড়াতে থাকলে প্রতিসরণ কোণও (r) বাড়তে থাকে। যে আপতন কোণের জন্য প্রতিসরণ কোণ ঠিক ৯০° হয় (অর্থাৎ প্রতিসরিত রশ্মি বিভেদতল ঘেঁষে যায়), তাকে ওই দুই মাধ্যমের ক্রান্তি কোণ বা সংকট কোণ (θc) বলে। কাচ ও বাতাসের জন্য sin θc = n₂/n₁ = ১/১.৫ = ২/৩, অর্থাৎ θc ≈ ৪১.৮° (প্রায় ৪২°)। আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বেশি হলে (i > θc, যেমন ৫০°), স্নেলের সূত্র sin r = (n₁/n₂) sin i অনুসারে sin r > ১ হতে হয়, যা অসম্ভব। ফলে আলো দ্বিতীয় মাধ্যমে প্রতিসরিত হতে পারে না; আপতিত আলোর শতভাগ প্রতিফলনের সূত্র মেনে প্রথম মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। একেই বলে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection)।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করেন কাচ একটি স্বচ্ছ মাধ্যম বলে আলো সবসময়ই কিছু না কিছু বাইরে বেরিয়ে যাবে, অথবা সংকট কোণের পর প্রতিসরণ কোণ আর না বেড়ে বিভেদতল ঘেঁষে ৯০° কোণেই আলো চলতে থাকবে। কিন্তু আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বড় হলে আলো কোনো বিভেদতল ঘেঁষে যায় না বা বাইরে যেতে পারে না। এমনকি কোনো রূপালী প্রলেপ বা দর্পণ ছাড়াই বিভেদতলটি ১০০% নিখুঁত প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে এবং আলো পুরোটা ভেতরেই প্রতিফলিত হয়। এই কারণেই অপটিক্যাল ফাইবার তারের ভেতর আলো আটকে রেখে সিগন্যাল বহুদূর পর্যন্ত পাঠানো সম্ভব হয়।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- সংকট কোণের চেয়ে বড় কোণে আলো আপতিত হলেও প্রতিসরিত রশ্মি বিভেদতল ঘেঁষে ৯০° কোণে যেতে থাকে
- দর্পণ ছাড়া স্বচ্ছ মাধ্যমের বিভেদতল থেকে আলো কখনোই সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হতে পারে না
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- টেলিযোগাযোগ ও উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট: বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্যাবল (SEA-ME-WE 4 ও SEA-ME-WE 5) এবং দেশজুড়ে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কে আলোক সংকেতের পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে ডেটা কোনো অপচয় ছাড়া দীর্ঘ দূরত্বে পৌঁছে দেওয়া হয়
- চিকিৎসাবিজ্ঞানে এন্ডোস্কোপি পরীক্ষা: মানবদেহের পাকস্থলী ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গের পরীক্ষা ও চিকিৎসার সময় নমনীয় অপটিক্যাল ফাইবার নলে আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের সাহায্যে দেহের ভেতরে আলো ফেলা ও ভেতরের স্পষ্ট ছবি ক্যামেরায় আনা হয়