স্প্রিন্ট দৌড়, অবাত শ্বসন ও এটিপি: পেশি ক্লান্তি
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার স্প্রিন্ট দৌড়ে অংশ নিল নবম শ্রেণির ছাত্রী রিমি। তীব্র গতিতে দৌড়ে প্রথম হয়ে ফিনিশ লাইন অতিক্রম করার পরপরই তার পায়ের মাংসপেশিতে তীব্র টান ও ব্যথা অনুভূত হতে লাগল এবং সে হাঁপাতে লাগল। স্বাভাবিক অবস্থায় কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ১ অণু গ্লুকোজ সবাত শ্বসনে সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে মোট ৩৮টি ATP উৎপন্ন করে। কিন্তু তীব্র দৌড়ের সময় পেশিকোষে অক্সিজেনের চরম ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সাময়িকভাবে অবাত শ্বসন (ল্যাকটিক অ্যাসিড সন্ধান) ঘটে। অক্সিজেনের এই ঘাটতিতে রিমির পেশিকোষে ১ অণু গ্লুকোজ থেকে শেষ পর্যন্ত কতটি ATP অণু উৎপন্ন হয়?
অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে পেশিকোষে ১ অণু গ্লুকোজের অবাত শ্বসনে কতটি ATP অণু উৎপন্ন হয়?
- ২টি ATP: অক্সিজেনের অভাবে মাইটোকন্ড্রিয়া কাজ করে না, শুধু গ্লাইকোলাইসিসে ২টি ATP পাওয়া যায়
- ৩৮টি ATP: অক্সিজেন থাকুক বা না থাকুক, ১ অণু গ্লুকোজ ভেঙে কোষে সমপরিমাণ শক্তিই পাওয়া যায়
- ০টি ATP: অক্সিজেন না থাকলে শ্বসন বন্ধ থাকে এবং কোষে কোনো শক্তি বা এটিপি উৎপন্ন হয় না
যা বদলাতে পারবে
- শ্বসনের ধরন: সবাত শ্বসন (অক্সিজেন উপস্থিত), অবাত শ্বসন (পেশিকোষে ল্যাকটিক অ্যাসিড সন্ধান)
- ধাপ: ১ থেকে ৪
- গ্লুকোজ অণু: ১ থেকে ২০ অণু
যা মেপে দেখাবে
- উৎপাদিত এটিপি (ATP)
- ব্যবহৃত অক্সিজেন (O₂)
- উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)
- বর্তমান ধাপ
চালানোর সময় খেয়াল করো
- প্রক্রিয়ার ধরন বদলে অবাত শ্বসন-এ যাও এবং শেষ ধাপ পর্যন্ত গিয়ে দেখো অক্সিজেনের অভাবে কতটি এটিপি তৈরি হয়।
নিজে করে দেখো
- ১ অণু গ্লুকোজের সবাত শ্বসনে ৩৮টি ATP পাওয়া যায়। তীব্র দৌড়ে রিমির পেশিকোষ অবাত শ্বসনে ঠিক ৩৮টি ATP পেতে চাইলে কত অণু গ্লুকোজ ভাঙতে হবে?
ইঙ্গিত
অবাত শ্বসনে প্রতি অণু গ্লুকোজে মাত্র ২টি ATP তৈরি হয়। ৩৮টি ATP পেতে ৩৮ ÷ ২ = ১৯ অণু গ্লুকোজ প্রয়োজন।
- সবাত শ্বসনে কোন ধাপে এসে বিজারিত কো-এনজাইমগুলো জারিত হয়ে এটিপি সংখ্যা একলাফে ৩৮টিতে পৌঁছায়? সেই ধাপটি নির্বাচন করো।
ইঙ্গিত
মাইটোকন্ড্রিয়ার অন্তর্পর্দায় ইলেকট্রন প্রবাহ তন্ত্রে (ETS) অক্সিজেন গ্রহণের মাধ্যমে ৩৪টি অতিরিক্ত ATP তৈরি হয়ে মোট ৩৮টি হয়।
- পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকলে ২ অণু গ্লুকোজ সম্পূর্ণ জারিত হয়ে মোট কতটি এটিপি তৈরি করে? সিমুলেশনে ২ অণু গ্লুকোজের সবাত শ্বসনের শেষ ধাপে যাও।
ইঙ্গিত
১ অণু গ্লুকোজে ৩৮টি ATP হলে, ২ অণু গ্লুকোজে ৩৮ × ২ = ৭৬টি ATP উৎপন্ন হয়।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
সবাত বনাম অবাত শ্বসন: এটিপি উৎপাদন ও কোষীয় শক্তি মুদ্রা
শ্বসন হলো সজীব কোষে সংঘটিত এমন একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যাতে খাদ্যবস্তু জারিত হয়ে রাসায়নিক শক্তি এটিপিতে (ATP) রূপান্তরিত হয়। অক্সিজেন উপস্থিত থাকলে সবাত শ্বসনে গ্লুকোজ ৪টি ধাপে (গ্লাইকোলাইসিস, অ্যাসিটাইল কো-এ সৃষ্টি, ক্রেবস চক্র ও ইলেকট্রন প্রবাহ তন্ত্র) সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে ৬ অণু CO₂, ৬ অণু H₂O এবং মোট ৩৮টি ATP (প্রায় ২,৩২১.৮ kJ শক্তি) তৈরি করে। কিন্তু স্প্রিন্ট দৌড় বা ভারী শারীরিক পরিশ্রমে পেশিকোষে অক্সিজেনের চরম ঘাটতি দেখা দিলে মাইটোকন্ড্রিয়া কাজ করতে পারে না। তখন সাইটোপ্লাজমেই অবাত শ্বসন ঘটে এবং পাইরুভিক অ্যাসিড বিজারিত হয়ে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে। অবাত শ্বসনে মাত্র ২টি ATP উৎপন্ন হয়, যা সবাত শ্বসনের ১৯ ভাগের মাত্র ১ ভাগ! পেশিকোষে এই ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়ায় তীব্র পেশি ক্লান্তি ও ব্যথার সৃষ্টি হয়, যা দৌড় শেষে গভীর শ্বাস নিয়ে অতিরিক্ত অক্সিজেন গ্রহণের (অক্সিজেন ঋণ পরিশোধ) মাধ্যমে দূর হয়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে শ্বসনে অক্সিজেন থাকুক বা না থাকুক গ্লুকোজ থেকে সমপরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে গ্লুকোজের সম্পূর্ণ জারণ ঘটে না; অধিকাংশ শক্তিই ল্যাকটিক অ্যাসিডের রাসায়নিক বন্ধনে আবদ্ধ থেকে যায়, ফলে অবাত শ্বসনে মাত্র ২টি ATP মুক্ত হয়। আবার কেউ কেউ মনে করে অক্সিজেন না থাকলে কোনো শক্তি তৈরি হতে পারে না। এটিও সঠিক নয়: প্রাচীনকাল থেকেই জীবদেহ অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতেও বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে গ্লাইকোলাইসিসের মাধ্যমে প্রতি গ্লুকোজে ২টি করে হলেও জরুরি ATP তৈরি করে জীবন টিকিয়ে রাখতে পারে।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- শ্বসনে অক্সিজেন থাকুক বা না থাকুক গ্লুকোজ থেকে সমপরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়
- অক্সিজেন না থাকলে জীবকোষ কোনো শক্তি বা ATP উৎপাদন করতে পারে না
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এ দৌড়বিদ ও ফুটবলারদের সহনশীলতা বাড়াতে বিশেষ অ্যারোবিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তীব্র গতিতেও কোষে রক্ত সঞ্চালন অক্সিজেন সরবরাহ বজায় রেখে ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা ও পেশি ক্লান্তি বিলম্বিত করতে পারে।
- বাংলাদেশের খাদ্য শিল্পে অণুজীবের অবাত সন্ধানকে কাজে লাগিয়ে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী দই (ল্যাকটোব্যাসিলাস দ্বারা ল্যাকটিক অ্যাসিড সন্ধান) এবং বেকারি শিল্পে ইস্টের সাহায্যে পাউরুটি ও বিস্কুট উৎপাদন করা হয়।