বাসে ব্রেক: যাত্রী কেন সামনে ঝুঁকে পড়েন?
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
ঢাকা শহরের মিরপুর রোডে একটি লোকাল বাস ৬ m/s সুষম বেগে চলছিল। বাসের ভেতরে মেঝের ওপর একজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ সামনে পথচারী চলে আসায় চালক ৩০০০ N ব্রেকিং বল প্রয়োগ করে বাসটিকে থামিয়ে দিলেন। বৃষ্টিতে বাসের মেঝেতে সাবান-পানি পড়ে যদি মেঝে পুরোপুরি পিচ্ছিল ও ঘর্ষণহীন (μ = ০) হয়ে যায়, তবে বাসটি থেমে যাওয়ার পর যাত্রীর বেগ কত থাকবে?
বাস থেমে যাওয়ার পর ঘর্ষণহীন পিচ্ছিল মেঝেতে থাকা যাত্রীর গতি কেমন হবে?
- আগের বেগেই (৬ m/s) সামনে চলতে থাকবে
- অদৃশ্য কোনো বলের ধাক্কায় আরও বেশি বেগে সামনের দিকে ছিটকে যাবে
- বাসের সাথেই থেমে যাবে, কারণ বাসের ওপর ব্রেক কাজ করছে
যা বদলাতে পারবে
- বাসের আদিবেগ: ২ থেকে ১২ m/s
- মেঝের ঘর্ষণ গুণাঙ্ক: ০ থেকে ১
- ব্রেকিং বল: ১,০০০ থেকে ৫,০০০ N
যা মেপে দেখাবে
- যাত্রীর শেষ বেগ (m/s)
- বাসের শেষ বেগ (m/s)
- যাত্রীর শেষ অবস্থান (m)
- যাত্রীর অতিক্রান্ত দূরত্ব (m)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- ঘর্ষণ গুণাঙ্ক μ = ০ করে চালিয়ে দেখো: বাসের ওপর ব্রেকিং বল কাজ করে বাসকে থামায়, কিন্তু ঘর্ষণ ছাড়া যাত্রীর ওপর কোনো অনুভূমিক বল কাজ করে কি?
নিজে করে দেখো
- বাসের মেঝেতে খাঁজকাটা রবারের ম্যাট বসিয়ে ঘর্ষণ বাড়াও: ঘর্ষণ গুণাঙ্ক μ এমনভাবে ঠিক করো যেন ব্রেক করার পর যাত্রী পিছলে না গিয়ে বাসের সাথেই থাকে (যাত্রীর শেষ বেগ বাসের শেষ বেগের কাছাকাছি অর্থাৎ ০.৩ m/s-এর কম হয়)।
ইঙ্গিত
ঘর্ষণ গুণাঙ্ক μ বাড়িয়ে ০.৩ বা তার বেশি করো। পর্যাপ্ত ঘর্ষণ বল কাজ করলে যাত্রী মেঝের ওপর না পিছলে বাসের সাথেই থেমে যায়।
- পিচ্ছিল মেঝেতে লম্বা পিছলানো: বাসের আদিবেগ অন্তত ৮ m/s করো এবং মেঝে ঘর্ষণহীন (μ = ০) রাখো, যেন যাত্রী সামনের দিকে পিছলে গিয়ে অন্তত ২৪ m পথ অতিক্রম করে।
ইঙ্গিত
বাসের আদিবেগ v বাড়িয়ে ৮ m/s বা তার বেশি করো এবং μ = ০ রাখো। বল না থাকলে গতির জড়তার কারণে যাত্রী পুরো সময় আদিবেগেই ছুটতে থাকে।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
গতির জড়তা ও নিউটনের প্রথম সূত্র
নিউটনের গতির প্রথম সূত্র অনুসারে, বাইরে থেকে কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকে এবং গতিশীল বস্তু সুষম দ্রুতিতে সরলরেখায় চলতে থাকে। বস্তুর নিজের গতি বা স্থির অবস্থা বজায় রাখার এই প্রবণতাই হলো জড়তা (Inertia)। বাস যখন চলছিল, তখন বাসের সাথে যাত্রীর পুরো শরীরও ৬ m/s গতিতে এগিয়ে চলছিল। চালক ব্রেক চাপলে ব্রেকিং বল কেবল বাসের ওপর কাজ করে এবং বাসকে থামিয়ে দেয়। মেঝের ঘর্ষণ শূন্য (μ = ০) হলে যাত্রীর ওপর অনুভূমিক কোনো বাধা বা বল প্রযুক্ত হয় না। তাই গতির জড়তার কারণে যাত্রী আগের ৬ m/s বেগেই সামনের দিকে চলতে থাকেন। বাস্তব জীবনে মেঝের ঘর্ষণ ও জুতার গ্রিপ যাত্রীর পায়ের তলায় বিপরীতমুখী বল দিয়ে পা থামায়, কিন্তু শরীরের উপরের অংশ জড়তার কারণে আগের গতিতেই চলতে চায়: ফলে যাত্রী সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করেন বাস ব্রেক করলে কোনো অদৃশ্য বল যাত্রীকে সামনের দিকে ধাক্কা দেয়। কিন্তু বাস্তবে সামনের দিকে কোনো বল কাজ করে না: যাত্রী আগে থেকেই যে গতিতে চলছিলেন, জড়তার কারণে ঠিক সেই গতিতেই চলতে থাকেন। আবার অনেকে মনে করেন বাস থামলে যাত্রীও নিজে থেকেই থেমে যাবেন। কিন্তু নিউটনের প্রথম সূত্র অনুযায়ী বল প্রয়োগ না করলে কোনো গতিশীল বস্তুর বেগ কমে না: মেঝেতে ঘর্ষণ বল না থাকলে যাত্রী কোনোভাবেই বাসের সাথে থামবেন না।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- বাস হঠাৎ ব্রেক করলে যাত্রীর ওপর সামনের দিকে কোনো ধাক্কা বা বল কাজ করে।
- বাসের ওপর ব্রেক চাপলে মেঝের ঘর্ষণ ছাড়াও যাত্রী আপনাআপনি বাসের সাথে থেমে যায়।
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- ঢাকা বা আন্তঃজেলা বাসে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করার সময় যাত্রীদের ছাদের হাতল শক্ত করে ধরে থাকা এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে সিটবেল্ট পরা: হঠাৎ ব্রেক করলে গতির জড়তার কারণে শরীর যেন সামনে ছিটকে না যায়, সেজন্য সিটবেল্ট ও হাতল বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করে যাত্রীকে নিরাপদে রাখে।
- বাসাবাড়িতে ধুলাবালিযুক্ত কম্বল, চাদর বা পোশাক ঝাঁকি দিয়ে ধুলা পরিষ্কার করা: কাপড়টিকে হঠাৎ টেনে গতিশীল করা হলেও স্থির জড়তার কারণে ধুলিকণাগুলো আগের জায়গাতেই স্থির থাকতে চায় এবং কাপড় থেকে আলাদা হয়ে নিচে পড়ে যায়।