শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া ও বয়েলের সূত্র: ফুসফুসে বায়ুর চাপ ও প্রবাহ
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
বিজ্ঞান ক্লাসে রাফি বুকে হাত রেখে একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস নিল এবং বুক ফুলে ওঠা লক্ষ্য করল। স্বাভাবিক অবস্থায় ফুসফুসের প্রারম্ভিক আয়তন ৩.০ L এবং অভ্যন্তরীণ বায়ুর চাপ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সমান (৭৬০ mmHg)। প্রশ্বাস গ্রহণের সময় মধ্যচ্ছদা (ডায়াফ্রাম) সংকুচিত হয়ে নিচে নেমে যায়, ফলে বক্ষগহ্বর প্রসারিত হয় এবং ফুসফুসের আয়তন ০.৫ L বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৫ L হয়। বাইরে থেকে পরিবেশের বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ বায়ুর চাপ কত হবে?
ফুসফুসের আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৫ L হলে ভেতরের বায়ুর চাপ কত হবে?
- প্রায় ৬৫১.৪ mmHg — আয়তন বাড়ায় বয়েলের সূত্রানুসারে ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ বায়ুর চাপ হ্রাস পায়
- প্রায় ৮৮৬.৭ mmHg — ফুসফুস প্রসারিত হলে ভেতরের বাতাস সংকুচিত হয়ে দেয়ালে বেশি চাপ দেয়
- ৭৬০ mmHg — বাতাস প্রবেশ না করা পর্যন্ত ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ চাপ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সমান থাকে
যা বদলাতে পারবে
- বক্ষগহ্বর ও ফুসফুসের আয়তন পরিবর্তন (ΔV): −১.৫ থেকে ১.৫ L
যা মেপে দেখাবে
- ফুসফুসের পরিবর্তিত আয়তন (L)
- বায়ু প্রবেশের পূর্বে ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ চাপ (mmHg)
- বায়ুমণ্ডলের সাথে চাপের পার্থক্য (ΔP) (mmHg)
- শ্বাস-প্রশ্বাসের বায়ু (টাইডাল ভলিউম) (mL)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- বক্ষগহ্বর প্রসারিত করে আয়তন পরিবর্তন ΔV = +০.৫ L করে দেখো। ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ চাপ ৭৬০ mmHg-এর চেয়ে কমছে না বাড়ছে? বায়ুর প্রবাহ কোন দিকে ঘটছে?
নিজে করে দেখো
- জোরে শ্বাস ছাড়ো: বুকের আয়তন এমনভাবে কমাও যাতে ফুসফুসের চাপ বাইরের বাতাসের চেয়ে ১৪০–১৬০ mmHg বেশি হয়।
ইঙ্গিত
আয়তন কমলে চাপ বাড়ে: p₁V₁ = p₂V₂।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
শ্বাস-প্রশ্বাসের মূলনীতি ও বয়েলের সূত্র
নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট ভরের গ্যাসের ক্ষেত্রে চাপ ও আয়তন পরস্পরের ব্যস্তানুপাতিক (বয়েলের সূত্র: P₁V₁ = P₂V₂)। মানুষের ফুসফুস বক্ষগহ্বরের একটি বায়ুরোধী প্রকোষ্ঠে অবস্থিত। প্রশ্বাসের সময় মধ্যচ্ছদা (ডায়াফ্রাম) সংকুচিত হয়ে নিচে নামে এবং পাঁজরের ইন্টারকোস্টাল পেশি সংকুচিত হয়ে বক্ষপিঞ্জরকে উপরে ও বাইরের দিকে তুলে ধরে। ফলে বক্ষগহ্বর ও ফুসফুসের আয়তন ৩.০ L থেকে বেড়ে ৩.৫ L হলে ভেতরের বায়ুর চাপ তাৎক্ষণিকভাবে ৭৬০ mmHg থেকে কমে প্রায় ৬৫১.৪ mmHg হয়। ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ চাপ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের চেয়ে কম হওয়ায় (চাপের পার্থক্য প্রায় -১০৮.৬ mmHg) পরিবেশের বাতাস নাসারন্ধ্র দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে। একইভাবে নিঃশ্বাসের সময় পেশি শিথিল হলে আয়তন কমে যায়, চাপ বেড়ে ৭৬০ mmHg-এর বেশি হয় এবং বাতাস বাইরে বেরিয়ে যায়।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
অনেকে মনে করে বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করার কারণে বুক ফুলে ওঠে, কিংবা আয়তন বাড়লে চাপও বেড়ে যায়। কিন্তু শারীরতাত্ত্বিক বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীত: আগে পেশির সংকোচনে বক্ষগহ্বর ও ফুসফুসের আয়তন বৃদ্ধি পায়। বয়েলের সূত্র অনুযায়ী আয়তন বাড়লে ভেতরের বায়ুর চাপ অবশ্যই কমে যায়। ফুসফুসের ভেতরে তৈরি হওয়া এই নিম্ন চাপই বায়ুমণ্ডলের বাতাসকে ভেতরে টেনে নেয়। ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ চাপ ৭৬০ mmHg স্থির থাকলে কিংবা চাপ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৮৬.৭ mmHg হলে বাতাস কখনো ভেতরে প্রবেশ করত না, বরং ফুসফুস থেকে উল্টো বাইরে বের হয়ে যেত।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- পাত্র বা ফুসফুসের আয়তন বৃদ্ধি পেলে আবদ্ধ গ্যাসের অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধি পায়
- বায়ু চলাচলের পূর্বে বক্ষগহ্বর বা ফুসফুস প্রসারিত হলেও অভ্যন্তরীণ বায়ুর চাপ অপরিবর্তিত থাকে
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- সিপিআর (CPR) ও অ্যাম্বু ব্যাগের সাহায্যে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস: বাংলাদেশে পানিতে ডোবা রোগী বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির স্বাভাবিক শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে সিপিআর বা অ্যাম্বু ব্যাগ (Ambu bag) ব্যবহার করা হয়; এতে বাইরে থেকে মুখ বা ব্যাগের ধনাত্মক চাপে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ করানো হয়, যা মানবদেহের প্রাকৃতিক ঋণাত্মক চাপীয় শ্বসনের কৃত্রিম বিকল্প।
- অ্যাজমা (হাঁপানি) ও ব্রংকাইটিসে ইনহেলার এবং নেবুলাইজার চিকিৎসা: বাংলাদেশে শীতকালীন ধূলিকণা ও বায়ুদূষণে অ্যাজমা আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্রংকিওল সরু হয়ে যায়; ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয়ে ফুসফুসে নিম্ন চাপ সৃষ্টি করলেও সরু নালীর উচ্চ বাধার কারণে বাতাস ঢুকতে পারে না। প্রেসারাইজড ইনহেলার ও নেবুলাইজারের মাধ্যমে দ্রুত ব্রঙ্কোডাইলেটর ওষুধ ফুসফুসে পৌঁছে দিয়ে শ্বাসনালী উন্মুক্ত করা হয়।