ট্যানারির জলাশয় ও অম্লত্ব অনুসন্ধান
মান বদলাও, চালাও, আর দেখো কী ঘটে।
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী (ট্যানারি) এলাকার একটি জলাশয়ের পানিতে এসিড বর্জ্য মিশেছে কি না তা যাচাই করতে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অনুসন্ধানমূলক কাজের পরিকল্পনা করল। তারা অনুমান করল (hypothesis) যে ট্যানারির বর্জ্যের কারণে জলাশয়ের পানি অম্লীয় হয়েছে। গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য জলাশয় থেকে ৫০ mL পানির নমুনা কনিক্যাল ফ্লাস্কে নেওয়া হলো, যাতে এসিডের ঘনমাত্রা ০.০২ mol/L। এরপর এতে নির্দেশক যোগ করে ব্যুরেট থেকে ০.১ mol/L ঘনমাত্রার সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH) ক্ষার দ্রবণ ফোঁটা ফোঁটা করে যোগ করা শুরু হলো। নমুনা পানিটিকে সম্পূর্ণ প্রশমিত করতে (তুল্যতা বিন্দুতে) কত mL ক্ষার দ্রবণ লাগবে?
নমুনা পানির ৫০ mL-কে পুরোপুরি প্রশমিত করতে (pH = ৭) কত mL ক্ষার দ্রবণ যোগ করতে হবে?
- ১০ mL : ৫০ mL নমুনায় থাকা ১ mmol এসিডকে প্রশমিত করতে ০.১ mol/L ক্ষারের ঠিক ১০ mL প্রয়োজন
- ৫০ mL : এসিডের আয়তন ৫০ mL হওয়ায় একে প্রশমিত করতে সমান আয়তনের ৫০ mL ক্ষার লাগবে
- ৫ mL : ক্ষারের ঘনমাত্রা বেশি হওয়ায় মাত্র ৫ mL যোগ করলেই দ্রবণ নিরপেক্ষ হয়ে যাবে
যা বদলাতে পারবে
- নমুনা পানির আয়তন: ১০ থেকে ১০০ mL
- যোগ করা NaOH ক্ষারের আয়তন: ০ থেকে ৫০ mL
- নির্দেশক: লিটমাস, সার্বজনীন নির্দেশক, ফেনলফথ্যালিন
যা মেপে দেখাবে
- দ্রবণের pH
- H⁺ আয়নের ঘনমাত্রা (mol/L)
- নমুনায় এসিডের পরিমাণ (mmol)
- যোগ করা ক্ষারের পরিমাণ (mmol)
চালানোর সময় খেয়াল করো
- যোগ করা ক্ষারের আয়তন ১০ mL-এর দিকে নিয়ে যাও। লক্ষ করো: ৯ mL থেকে ১১ mL-এ যেতেই pH কীভাবে হঠাৎ ২.৭৭ থেকে ১১.২১-এ লাফিয়ে ওঠে এবং নির্দেশকের রঙ বদলে যায়?
নিজে করে দেখো
- নমুনা পানির আয়তন ২০ mL নাও এবং ব্যুরেট থেকে ক্ষার যোগ করে নমুনাটিকে ঠিক নিরপেক্ষ (তুল্যতা বিন্দু) করো।
ইঙ্গিত
২০ mL নমুনায় এসিড থাকে ২০ × ০.০২ = ০.৪ mmol। ০.১ mol/L ক্ষার থেকে ৪ mL যোগ করলে তুল্যতা বিন্দুতে পৌঁছাবে।
- নির্দেশক হিসেবে সার্বজনীন নির্দেশক (universal indicator) নির্বাচন করো এবং ক্ষার যোগ করে দ্রবণটিকে ক্ষারীয় করো যাতে pH অন্তত ১০ হয়।
ইঙ্গিত
নির্দেশক তালিকায় সার্বজনীন নির্দেশক বাছাই করো এবং তুল্যতা বিন্দুর চেয়ে বেশি ক্ষার যোগ করে pH ১০-এর উপরে নাও।
- নমুনা পানির আয়তন ৮০ mL করো এবং নির্দেশক ফেনলফথ্যালিন নির্বাচন করে দ্রবণটি পুরোপুরি প্রশমিত করো।
ইঙ্গিত
৮০ mL পানিতে এসিড থাকে ১.৬ mmol। ০.১ mol/L ক্ষারের ১৬ mL যোগ করলে তুল্যতা বিন্দু অর্জিত হয়।
ধারণাটা কী?আগে নিজে চালিয়ে দেখো, তারপর খোলো।
রসায়নে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া: অনুমিত সিদ্ধান্ত (hypothesis) গঠন ও পরীক্ষণ
রসায়নে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মূল ভিত্তি হলো যুক্তিসঙ্গত অনুমিত সিদ্ধান্ত (hypothesis) গঠন এবং তা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা। সাভারের ট্যানারি বর্জ্য মিশ্রিত জলাশয়ের পানির নমুনা পরীক্ষায় দেখা যায় যে এর প্রাথমিক pH ছিল ১.৭০ এবং এটি নীল লিটমাসকে লাল করে, যা পানির অম্লীয় প্রকৃতি নিশ্চিত করে। প্রশমন বিক্রিয়ায় এসিড ও ক্ষার মোলার সমতায় বিক্রিয়া করে: HCl + NaOH → NaCl + H₂O। ৫০ mL ০.০২ mol/L নমুনা পানিতে মোট এসিডের পরিমাণ ১.০ mmol (৫০ × ০.০২)। ব্যুরেটের ০.১ mol/L ক্ষার থেকে ঠিক ১০ mL যোগ করলেই ১.০ mmol OH⁻ সরবরাহ হয় এবং সমস্ত এসিড প্রশমিত হয়ে পানি নিরপেক্ষ (pH = ৭) হয়। প্রাপ্ত পরীক্ষামূলক ফলাফল শুরুতে গঠিত হাইপোথিসিসকে সম্পূর্ণভাবে প্রমাণ করে।
অন্য উত্তরগুলো কেন ভুল
৫০ mL উত্তরটি ভুল, কারণ বিভিন্ন ঘনমাত্রার ক্ষেত্রে শুধু তরলের আয়তন সমান হলেই দ্রবণ নিরপেক্ষ হয় না। ক্ষারের ঘনমাত্রা (০.১ mol/L) এসিডের (০.০২ mol/L) চেয়ে ৫ গুণ বেশি হওয়ায় ৫০ mL ক্ষার যোগ করলে তীব্র ক্ষারীয় দ্রবণ (pH > ১২) তৈরি হতো। আবার ৫ mL উত্তরটিও ভুল, কারণ ৫ mL ক্ষারে মাত্র ০.৫ mmol OH⁻ থাকে, ফলে ০.৫ mmol এসিড অবশিষ্ট থেকে পানি অম্লীয়ই (pH ২.০৪) থেকে যেত। সম্পূর্ণ প্রশমনের জন্য ঠিক ১০ mL ক্ষার প্রয়োজন।
যেসব ভুল ধারণা হয়
- ঘনমাত্রা যা-ই হোক না কেন সমপরিমাণ এসিড প্রশমিত করতে সবসময় সমান আয়তনের ক্ষার প্রয়োজন হয়
- ক্ষারের ঘনমাত্রা বেশি হলে মোল হিসাব না করে যৎসামান্য ক্ষার যোগ করলেই দ্রবণ নিরপেক্ষ হয়ে যায়
বাস্তবে কোথায় দেখা যায়
- সাভার ও হেমায়েতপুরের ট্যানারি শিল্প এলাকায় চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ বর্জ্যের এসিড ও ভারী ধাতু পরীক্ষা করে তরল বর্জ্য শোধনাগারে (ETP) চুন যোগ করে ধলেশ্বরী নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখা।
- বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলের জলাশয় এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে অম্লীয় হয়ে পড়া মাছের ঘের ও পুকুরের পানির pH নিয়মিত পরীক্ষা করে চুন (CaO বা CaCO₃) প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ চাষের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা।